যুদ্ধের নরককুণ্ড ও ৬৮ ঘণ্টার বাসযাত্রা শেষে বিশ্বমঞ্চে ইরাক!

বিশ্বকাপে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর, দুঃসাহসিক এবং অবিশ্বাস্য গল্পটি বোধহয় লিখে ফেলেছে ইরাক ফুটবল দল। প্রতিবেশী ইরানে চলমান যুদ্ধ, বিমান হামলা, বন্ধ আকাশসীমা আর একের পর এক মরণ-বাঁচন ম্যাচের পরীক্ষা পেরিয়ে দীর্ঘ ৪০ বছর পর বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে ফিরেছে ‘মেসোপটেমিয়ার সিংহ’রা।

আর এই অবিশ্বাস্য রূপকথার নেপথ্য কারিগর দলটির অভিজ্ঞ অস্ট্রেলিয়ান হেড কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড। স্পেনে বিশ্বকাপের চূড়ান্ত প্রস্তুতি ক্যাম্পে যাওয়ার ঠিক আগে বাগদাদ থেকে ফোনে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ৬২ বছর বয়সী এই কোচ বলেন, গত একটা বছর আমার আর আমার ফুটবলারদের ওপর দিয়ে যে ঝড় গেছে, তা এক কথায় পাগলামি এবং চরম মানসিক চাপের। আমার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে প্রতিটি ম্যাচই ছিল আমাদের জন্য জীবন-মরণের লড়াই।

Australian coach Graham Arnold
আর্নল্ডের এই বক্তব্যকে বাড়িয়ে বলা মনে হতে পারে, কিন্তু ইরাকের জন্য বাস্তবতা এর চেয়েও অনেক বেশি নির্মম ছিল। গত বছরের মে মাসে স্প্যানিশ কোচ জেসুস কাসাসের স্থলাভিষিক্ত হন আর্নল্ড। তখন এশিয়ান কোয়ালিফায়িংয়ের গ্রুপ ‘বি’-তে দক্ষিণ কোরিয়া ও জর্ডানের পেছনে থেকে সরাসরি টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ে ছিল ইরাক।

কিন্তু আর্নল্ডের অভিষেক ম্যাচেই ১০ জনের ইরাক হেরে বসে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছে। এরপর নাটকীয় প্লে-অফে সংযুক্ত আরব আমিরাতকে হারাতে হয় তাদের, যেখানে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়েরও ১৭তম মিনিটে (১৭ মিনিট ইনজুরি টাইম!) আমির আল-আম্মারির পেনাল্টি গোলে বেঁচে থাকে ইরাকের স্বপ্ন।

Iraq Football Team 03
৬৮ ঘণ্টার নরক যন্ত্রণা ও ট্রাভেল ট্র্যাজেডি

আসল যুদ্ধ শুরু হয় গত মার্চে, যখন মেক্সিকোতে ইন্টারকন্টিনেন্টাল প্লে-অফ খেলার প্রস্তুতি নিচ্ছিল ইরাক। ঠিক ওই সময়ে ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরাইলের আকস্মিক বিমান হামলার কারণে ইরাকের আকাশসীমা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোচ আর্নল্ড তাঁর কোচিং সরঞ্জাম নিয়ে বাগদাদে ঢুকতে পারছিলেন না, আর ফুটবলাররা দেশ থেকে বের হতে পারছিলেন না।

সেই দুঃসহ স্মৃতির রোমন্থন করে আর্নল্ড বলেন, আকাশপথ বন্ধ থাকায় আমরা বাগদাদ থেকে জর্ডানের আম্মান পর্যন্ত ২৬ ঘণ্টার এক ক্লান্তিকর বাস যাত্রা করি। সেখানে পৌঁছানোর পর চারপাশে একের পর এক বোমা বিস্ফোরণের কারণে জর্ডানের আকাশসীমাও বন্ধ হয়ে যায় এবং প্লেয়াররা সেখানে ২৮ ঘণ্টা আটকে থাকে। সব মিলিয়ে যখন ছেলেরা মেক্সিকোর মন্টেরিতে পৌঁছায়, ঘড়ির কাঁটায় তখন ৬৮ ঘণ্টা পার হয়ে গেছে! ছেলেদের সাথে প্রথম মিটিংয়েই আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম,মিডল ইস্টের এই যুদ্ধকে তোমরা অজুহাত বানাবে, নাকি মাঠে জ্বলে ওঠার জ্বালানি?

Iraq Football Team 04
ছেলেরা জবাব দিয়েছিল মাঠেই। মন্টেরিতে বলিভিয়াকে ২-১ গোলে হারিয়ে দীর্ঘ ২১ ম্যাচের এক ক্লান্তিকর বাছাইপর্ব শেষে ১৯৮৬ সালের পর প্রথমবার বিশ্বকাপের টিকিট কাটে ইরাক। ৪ কোটি ৬০ লাখ মানুষের চাপ মাথায় নিয়ে ফুটবলাররা যে যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে গেছেন, তা ছিল অবিশ্বাস্য।

নেতিবাচক মানসিকতা বদলানোর মিশন

ইরাক ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যে নিয়মিত যাতায়াত করা আর্নল্ড মনে করেন, ইরাকি ফুটবলারদের প্রতিভার কোনো কমতি নেই, তবে তাঁর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘ ৩০ বছরের যুদ্ধ-বিগ্রহে (১৯৯১ ও ২০০৩ সালের উপসাগরীয় যুদ্ধ) পিষ্ট একটি দেশের ফুটবলারদের নেতিবাচক মানসিকতা পরিবর্তন করা। তাঁর ভাষায়, এখানে একটা মনস্তত্ত্ব কাজ করে যে, আমাদের কেউ পছন্দ করে না, সবাই আমাদের ঘৃণা করে। অথচ এই দেশের মানুষ ফুটবলের জন্য কতটা পাগল, তা আমি নিজে দেখেছি। বার্সেলোনা বনাম রিয়াল মাদ্রিদের এল ক্লাসিকো ম্যাচ থাকলে ইরাকে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়!

Iraq Football Team 02
২০২২ কাতার বিশ্বকাপে নিজের দেশ অস্ট্রেলিয়াকে শেষ ১৬-তে নিয়ে গিয়েছিলেন আর্নল্ড, যেখানে চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার ঘাম ছুটিয়ে দিয়েছিল তাঁর দল। তবে ইরাকিদের ভালোবাসায় সিক্ত এই কোচ মনে করেন, নিজের দেশের কোচ থাকার চেয়ে ইরাকের কোচ হিসেবে তিনি অনেক বেশি চাপমুক্ত ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারছেন।

‘বিশ্বকে চমকে দেওয়ার পালা’

আগামী ৩১ জুলাই চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া আর্নল্ড এবার গ্রুপ পর্বে এক কঠিন গ্রুপে পড়েছেন। আগামী ১৬ জুন বোস্টনে আর্লিং হালান্ডের নরওয়ের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ইরাক। ‘গ্রুপ অব ডেথ’-এ তাদের অন্য দুই প্রতিপক্ষ পরাশক্তি ফ্রান্স এবং আফ্রিকার সিংহ সেনেগাল।

Iraq Football Team 01
বাস্তবতার নিরিখে ইরাক কতদূর যেতে পারে? আর্নল্ডের সসি এবং সোজাসাপ্টা জবাব, আমরা সবার শেষে কোয়ালিফাই করেছি। খেলোয়াড়দের দলবদল বা ট্রান্সফার মার্কেট ভ্যালু হিসাব করলে আমরাই সম্ভবত এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে সস্তা ও লোয়েস্ট-র‍্যাংকড দল। কিন্তু মনে রাখবেন, এটা ফুটবল বিশ্বকাপ, এখানে যেকোনো মুহূর্তে যেকোনো রূপকথা ঘটতে পারে। মাঠে লড়াইটা ১১ বনাম ১১ জনের। আমার ছেলেদের ভেতর এক লড়াকু মানসিকতা আছে। আমরা যদি ওয়ান-টু-ওয়ান লড়াইগুলো জিতে নিতে পারি, তবে এই ইরাক দলটাই এবার পুরো বিশ্বকে চমকে দেবে।

যুদ্ধের ছাই থেকে উঠে আসা এই মেসোপটেমিয়ান সিংহরা এবার বিশ্বমঞ্চে কেমন গর্জন ছাড়ে, তা দেখতে মুখিয়ে আছে পুরো ফুটবল দুনিয়া।