ইরানের ফুটবল ইতিহাসের তৃতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং দেশের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার সরদার আজমুনকে ছাড়াই বিশ্বকাপের রণক্ষেত্রে নামছে ‘টিম মেল্লি’। তবে ৩১ বছর বয়সী এই তারকার বিশ্বকাপ স্কোয়াড থেকে বাদ পড়াটা কোনো সাধারণ ফর্ম বা ইনজুরির চোট নয়; বরং এর পেছনে রয়েছে এক চরম রাজনৈতিক বিতর্ক ও ওলটপালট। তুরস্কের প্রস্তুতি শিবিরে ঘাম ঝরানো ইরানি দলের সাথে এই মুহূর্তে আজমুন নেই। শেষ মুহূর্তে অলৌকিক কোনো ডাক না পেলে এই ফরোয়ার্ডের বিশ্বকাপ খেলা যে শুধু স্বপ্নই থেকে যাচ্ছে, তা এক প্রকার নিশ্চিত।
যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে অনুষ্ঠেয় এবারের বিশ্বকাপটি ইরানের জন্য এমনিতেই এক অগ্নিপরীক্ষা। আমেরিকা ও ইসরাইলের সাথে পাঁচ সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর এক নড়বড়ে যুদ্ধবিরতির আবহে এবার বিশ্বমঞ্চে নামছে তারা। আর এই চরম উত্তেজনার মাঝেই আজমুনের ওপর আছড়ে পড়ল ঘরোয়া রাজনীতির খাঁড়া। সংযুক্ত আরব আমিরাতের (যা আমেরিকার অন্যতম মিত্র দেশ) ঘরোয়া লিগে খেলা এই স্ট্রাইকার গত মার্চ মাসে যুদ্ধের চরম মুহূর্তে দুবাইয়ের শাসকের সাথে একটি ছবি তুলে নেট দুনিয়ায় পোস্ট করেন। ব্যস, তাতেই ক্ষোভে ফেটে পড়ে ইসলামিক রিপাবলিকের কট্টরপন্থী গণমাধ্যমগুলো।
সরকারপন্থী ‘ফারস নিউজ এজেন্সি’ সরাসরি আজমুনকে তোপ দেগে লেখে, ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে সরদার আজমুন ভুল পক্ষে গিয়ে দাঁড়িয়েছেন। অবসরে ঘোড়দৌড়ের ঘোড়া প্রজনন করা আজমুনকে খোঁচা দিয়ে তারা আরও যোগ করে, ভুল ঘোড়ার ওপর বাজি ধরে আজমুন এমন এক জুয়া খেলেছেন, যার মাশুল হিসেবে তাঁকে বিশ্বকাপ মিস করতে হচ্ছে। অথচ আজমুনের ৫৮ লক্ষ ফলোয়ারের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে দুবাইয়ের শাসক শেখ মোহাম্মদ বিন রশিদ আল মাকতুমের সাথে সেই সাক্ষাতের ছবিটি এখনো দগদগে ক্ষতের মতো ‘পিন’ করা রয়েছে।
‘কারণটা ফুটবলীয় নয়, শতভাগ রাজনৈতিক’
অবশ্য আজমুনের সাথে ইরানি কট্টরপন্থীদের এই দা-কুমড়ো সম্পর্ক নতুন কিছু নয়। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের আগেও দেশের সরকার-বিরোধী আন্দোলনকে সমর্থন করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দিয়ে কট্টরপন্থীদের তোপের মুখে পড়েছিলেন তিনি। সেবার অনেক নাটকের পর দলে জায়গা পেলেও এবার আর পার পাননি।
চলতি মাসের শুরুতে ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে আজমুনও যেন নিজের এই ভাগ্যকে মেনে নিয়েছেন। সতীর্থদের সাফল্য কামনা করে তিনি লিখেছেন, আমি যেখানেই ফুটবল খেলি না কেন, আমার পরিচয়, আমার হৃদয় আর আমার অহংকারজুড়ে সবসময় থাকবে ইরান।
কিন্তু ইরানি ফুটবলের খবরাখবর রাখা বিখ্যাত পডকাস্টার এরফান হোসেইনি সরাসরি এএফপিকে বলেন, আজমুনকে যে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক কারণে বাদ দেওয়া হয়েছে, তা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট। আরব আমিরাতের লিগে খেলা আরও অনেক ফুটবলারকে দলে ডাকা হয়েছে, যাদের পারফরম্যান্স পরিসংখ্যান আজমুনের চেয়েও খারাপ।
এমনকি ইরানের প্রভাবশালী ফুটবল ফেডারেশনের প্রধান মেহেদি তাজও এই সপ্তাহে জানিয়েছেন যে, আজমুনকে দলে ফেরানোর কোনো পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না। যদিও ইরানের ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদুলকরিম হোসেনজাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্সে আজমুনকে জাতীয় দলে ফিরিয়ে আনার জোর দাবি তুলেছেন।
দেশের জন্য কোটি টাকার প্রস্তাব পায়ে ঠেলা ‘ইরানের সন্তান’
তুর্কমেনিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি পূর্ব ইরানের গোনবাদ-ই কাভুস-এ জন্ম নেওয়া এই তুর্কমেনী তরুণ কম বয়সেই নিজের জাত চিনিয়েছিলেন। কৈশোরেই রাশিয়ার রুবিন কাজান, রোস্তভ এবং ২০১৯ সালে জায়ান্ট ক্লাব জেনিত সেন্ট পিটার্সবার্গে খেলে গোলবন্যা বইয়ে দেন।
২০২২ সালে তিনি নাম লেখান জার্মান ক্লাব বায়ার লেভারকুসেনে, মাঝখানে রোমাতে ধারে খেলে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে দুবাইয়ের শাবাব আল আহলি ক্লাবে যোগ দেন। দেশের হয়ে ৯১ ম্যাচে ৫৭টি গোল করা আজমুন বর্তমানে কিংবদন্তি আলী দাই এবং বর্তমান তারকা মেহেদি তারেমির পরেই দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় ৩ নম্বরে আছেন।
তুর্কি ও রুশসহ বেশ কয়েকটি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারা আজমুন তাঁর পোস্টে আবেগঘন কণ্ঠে প্রকাশ করেন, মাত্র ১৭ বছর বয়সে যখন তিনি জাতীয় দলেও ডাক পাননি, তখন এক বিদেশি রাষ্ট্র থেকে তাঁর কাছে বিশাল অঙ্কের আর্থিক চুক্তি এসেছিল। আজমুন বলেন, আমার একমাত্র জবাব ছিল, আমি ইরানের সন্তান। আমি আমার দেশের মানুষের জন্য খেলে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চাই।
আজমুনকে ছাড়া বা আজমুনকে নিয়েই হোক, ইরানের এই প্রতিভাবান দলটিকে এখন বাইরের সব রাজনৈতিক কোলাহল ও বিতর্ক বুড়ো আঙুল দেখিয়ে মাঠের যুদ্ধে মন দিতে হবে। পডকাস্টার হোসেইনি ঠিকই বলেছেন, এই দলটা প্রচণ্ড চাপ নিতে অভ্যস্ত, কিন্তু এবারের অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক রাজনৈতিক আবহাওয়াটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। গ্যালারিতে থাকা দেশের ভেতরের ও বাইরের কোটি কোটি ইরানি ভক্তদের মুখে হাসি ফোটাতে টিম মেল্লি এখন কতটা তৈরি, সেটাই দেখার বিষয়।