গত বছর মিউনিখের মাঠে ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে ফুটবলীয় নান্দনিকতার যে প্রদর্শনী প্যারিস সেন্ট জার্মেইন (পিএসজি) দেখিয়েছিল, শনিবার রাতে বুদাপেস্টের পুসকাস অ্যারেনায় দেখা গেল তার ঠিক উল্টো চিত্র। আর্সেনালের কোচ মিকেল আর্তেতার গড়ে তোলা নিশ্ছিদ্র লাল প্রাচীরের সামনে এবার পিএসজির চেনা ছন্দের ধার কিছুটা কম মনে হলেও, তারা জয় ছিনিয়ে নেওয়ার অন্য এক পথ খুঁজে নিল। নির্ধারিত ও অতিরিক্ত সময়ে ১-১ গোলে সমতার পর টাইব্রেকারে ৪-৩ ব্যবধানে আর্সেনালকে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি ঘরে তুলেছে লুইস এনরিকের দল। এই জয়ের পথে এক মৌসুমে সর্বোচ্চ গোলের ঐতিহাসিক এক রেকর্ডও স্পর্শ করেছে ফরাসি জায়ান্টরা।
ম্যাচ শেষে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পিএসজি বস লুইস এনরিকে বলেন, দলের অন্যতম সেরা গুণ হলো আমাদের মানসিক দৃঢ়তা ও ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা। আমরা যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে পারি। আর্সেনাল ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে থাকা অবস্থায় ম্যাচ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সবচেয়ে সেরা দল, আজ আমরা প্রমাণ করেছি যে সেই পরিস্থিতি থেকেও ম্যাচ বের করা সম্ভব।
খেলার মাত্র ৬ মিনিটে কাই হাভার্টজের গোলে আর্সেনাল যখন এগিয়ে যায়, তখন পুরোনো পিএসজি হলে হয়তো ম্যাচ থেকে ছিটকে যেত। কারণ, এই ফাইনালে আসার পথে আর্সেনাল পুরো টুর্নামেন্টে মাত্র ৬টি গোল খেয়েছিল এবং রেকর্ড সর্বোচ্চ ৯টি ম্যাচে কোনো গোলই হজম করেনি। প্রথমার্ধে পিএসজির বলের দখল একচেটিয়া থাকলেও আরসিবির রক্ষণভাগ বা আর্সেনালের গোলরক্ষক ডেভিড রায়াকে সেভাবে কোনো পরীক্ষাই দিতে হয়নি। আর্সেনালের জমাট রক্ষণে কার্যত বন্দি ছিলেন পিএসজির দুই তারকা খভিচা কভারাতসখেলিয়া এবং ডেজিরে দুয়ে।
তবে পিএসজি ধৈর্য হারায়নি। পুরো ম্যাচে যেখানে আর্সেনাল মাত্র ১৯৯টি পাস সম্পন্ন করতে পেরেছিল, সেখানে পিএসজি খেলেছে রেকর্ড ৮৩৭টি পাস এবং বলের দখল রেখেছিল ৭০ শতাংশের বেশি। অবশেষে দ্বিতীয়ার্ধের মাঝামাঝি সময়ে বক্সের ভেতর কভারাতসখেলিয়াকে ক্রিস্টিয়ান মসকেরা ফাউল করলে পেনাল্টি পায় পিএসজি। ওসমানে ডেম্বেলের সফল স্পট কিক থেকে সমতায় ফেরে প্যারিসের দলটি। এই গোলের মাধ্যমে চলতি মরশুমে চ্যাম্পিয়ন্স লিগে নিজেদের ৪৫তম গোল সম্পন্ন করল পিএসজি, যা ১৯৯৯-২০০০ মরশুমে বার্সেলোনার গড়া এক মরশুমে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ডের সমান।
অতিরিক্ত সময়ে দুই দলই কিছুটা ছন্নছাড়া ফুটবল খেললে ম্যাচ গড়ায় পেনাল্টি শুটআউটে। সেখানে আর্সেনালের ডিফেন্ডার গ্যাব্রিয়েল শট পোস্টের ওপর দিয়ে উড়িয়ে মারলে ৪-৩ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত হয় পিএসজির। রিয়াল মাদ্রিদের পর দ্বিতীয় দল হিসেবে চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ইতিহাসে টানা দুইবার শিরোপা ধরে রাখার অনন্য কীর্তি গড়ল তারা। এই জয়টি লুইস এনরিকের জন্য কোচের ক্যারিয়ারে তৃতীয় চ্যাম্পিয়ন্স লিগ খেতাব (২০১৫ সালে বার্সেলোনার হয়ে প্রথম)।
ম্যাচ শেষে পিএসজির উইঙ্গার ডেজিরে দুয়ে বলেন, আমাদের নম্র থাকতে হবে। আমাদের জার্সি বা মুকুটে দ্বিতীয় তারাটি যুক্ত হলো, তবে এখানেই শেষ নয়। আমরা কঠোর পরিশ্রম করে এবার তৃতীয় ট্রফির জন্য ঝাঁপাব। দীর্ঘ ২২ বছর পর ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ জয়ী আর্সেনালকে হারানোর এই লড়াইটি গত বছরের চেয়েও বেশি তৃপ্তির ছিল বলে মনে করেন এনরিকে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ ৬৩ ম্যাচের এক ক্লান্তিকর মৌমুম শেষে ইউরোপ সেরার ট্রফি ছোঁয়া না হলেও আজ রবিবার উত্তর লন্ডনের রাস্তায় ছাদখোলা বাসে প্যারেড করবে গানার্সরা। ফাইনালে হারলেও আগামী মরশুমে পিএসজিকে সিংহাসনচ্যুত করার সবচেয়ে বড় দাবিদার হিসেবেই মাঠে নামবে আর্তেতার দল।