ফুটবল বিশ্বকাপের রণক্ষেত্র মাঠের সীমানা ছাড়িয়ে এবার আছড়ে পড়েছে টাকার অঙ্কে। দলগুলো উত্তর আমেরিকার সবুজ ঘাসে বুটের লড়াইয়ে নামার আগেই খাতা-কলমে কার ওজন কত, তার এক বিস্ফোরক ও চটকদার খতিয়ান প্রকাশ করেছে ফুটবল গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ট্রান্সফাররুম’।
খেলোয়াড়দের বয়স, ফর্ম, ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা, লিগের মান আর চুক্তির মেয়াদের মতো কঠিন সব সমীকরণ কষে তারা বিশ্বকাপের দলগুলোর যে বাজারমূল্য নির্ধারণ করেছে, তা দেখে লাতিন আমেরিকার ফুটবল ভক্তদের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য! মাঠের লড়াইয়ে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা রাজত্ব করলেও, টাকার বাজারে ছড়ি ঘোরাচ্ছে ইউরোপের দলগুলো।
ট্রান্সফাররুমের এই নতুন চুলচেরা বিশ্লেষণে বিশ্বজয়ের মঞ্চে সবচেয়ে ‘দামি’ বা মূল্যবান স্কোয়াড হিসেবে হুংকার ছাড়ছে কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স। ফরাসিদের ২৬ সদস্যের স্কোয়াডের মোট বাজারমূল্য আকাশচুম্বী ১.৪৬ বিলিয়ন ইউরো! টাকার এই পাহাড় নিয়ে তালিকার মগডালে বসে আছে ফরাসোরা।
ফরাসিদের ঠিক ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ইউরোর বর্তমান চ্যাম্পিয়ন স্পেন; যাদের বাজারমূল্য ১.৪১ বিলিয়ন ইউরো। এর পরপরই তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম স্থানে রয়েছে যথাক্রমে থ্রি-লায়ন্স ইংল্যান্ড (১.৪০ বিলিয়ন ইউরো), জার্মানি (১.১৩ বিলিয়ন ইউরো) এবং ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল (১.০১ বিলিয়ন ইউরো)। অর্থাৎ, তালিকার শীর্ষ পাঁচটি স্থানই নিজেদের দখলে রেখে ইউরোপীয় লিগগুলোর টাকার গরম দেখাল তারা।
বাজার মূল্যে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার দৈন্যদশা
বিশ্বকাপের নাম শুনলেই যাদের কথা সবার আগে মাথায় আসে, সেই লাতিন দুই পরাশক্তি ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার বাজারমূল্য ইউরোপের দলগুলোর তুলনায় অনেকটাই ফিকে। হেক্সা জয়ের মিশনে নামা সেলেসাওরা এই তালিকায় রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে।
ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, রাফিনহা কিংবা নেইমারের মতো তারকাদের নিয়েও ব্রাজিলের পুরো স্কোয়াডের আনুমানিক মূল্য ৯৪১ মিলিয়ন ইউরো, যা ফ্রান্সের চেয়ে অনেক কম।
তবে, ব্রাজিল দলে ভিনিসিয়ুস ও নেইমারের মতো অভিজ্ঞদের পাশাপাশি এন্ড্রিক ও রায়ানের মতো তরুণ প্রতিভারা থাকায় তারা ভবিষ্যতে আরও দামি হয়ে উঠবে বলে আশা করা হচ্ছে। বর্তমানে ব্রাজিল স্কোয়াডের সবচেয়ে দামি ঘোড়া ভিনিসিয়ুস জুনিয়র, যার বাজারমূল্য ১২৮ মিলিয়ন ইউরো। তবে দুঃখের বিষয় হলো, বিশ্বকাপের সামগ্রিক দামি খেলোয়াড়দের তালিকায় ভিনি দশম স্থানে নেমে গেছেন।
অন্যদিকে, বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার অবস্থা আরও করুণ। লিওনেল মেসিকে দলে নিয়েও আকাশী-সাদাদের বাজারমূল্য মাত্র ৭৩৯ মিলিয়ন ইউরো এবং দামি দলের তালিকায় তাদের অবস্থান অষ্টম! তাদের ওপরে সপ্তম স্থানটি দখল করে রেখেছে নেদারল্যান্ডস (৮৬৭ মিলিয়ন ইউরো)।
এক সময় ফুটবল ইতিহাসের সমস্ত রেকর্ড চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ২০১৭ সালে ২২২ মিলিয়ন ইউরোর রেকর্ড ট্রান্সফার ফিতে বার্সেলোনা ছেড়ে পিএসজিতে যোগ দিয়েছিলেন নেইমার জুনিয়র। কিন্তু বিধি বাম! বয়স বাড়ার সাথে সাথে সাম্প্রতিক সময়ের একের পর এক চোট আর মাঠের বাইরের বিতর্কের চোরাবালিতে পড়ে বর্তমানে তাঁর বাজারমূল্য ধসে গেছে। ফুটবল ইতিহাসের এক সময়ের সবচেয়ে দামি হিরের টুকরোটি এখন ক্ষয়ে যাওয়া এক তারকায় পরিণত হয়েছে।
ইয়ামালের রাজত্বে এমবাপে-হালান্ডদের হাহাকার
দলগত লড়াইয়ের বাইরে ব্যক্তিগত বাজারমূল্যের তালিকায় এসেছে এক ঐতিহাসিক মোড়। মাত্র ১৮-১৯ বছর বয়সেই পুরো ফুটবল বিশ্বকে নিজের পায়ের জাদুতে বুঁদ করে রাখা স্পেনের তরুণ সেনসেশন লামিনে ইয়ামাল এখন বিশ্বকাপের সবচেয়ে মূল্যবান ফুটবলার! ট্রান্সফাররুমের হিসেবে বার্সেলোনার এই বিস্ময় বালকের বর্তমান বাজারমূল্য ২৫৪ মিলিয়ন ইউরো, যা ভাবাও কল্পনাতীত।
ইয়মালের পরেই দ্বিতীয় স্থানে রয়েছেন ম্যানচেস্টার সিটির নরওয়েজিয়ান গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড, যার আনুমানিক মূল্য ১৯৯ মিলিয়ন ইউরো। আর রিয়াল মাদ্রিদের ফরাসি মহাতারকা কিলিয়ান এমবাপের বাজারমূল্য ১৮০ মিলিয়ন ইউরো নিয়ে রয়েছেন তালিকার তৃতীয় স্থানে। এখন দেখার বিষয়, কাগজের এই কোটি কোটি ইউরোর গরম আমেরিকার মাঠের লড়াইয়ে কতটা কাজে আসে, নাকি সব হিসাব উল্টে দিয়ে কোনো আন্ডারডগ দল বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটি বগলদাবা করে নিয়ে যায়!