বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফিটা ছুঁয়ে দেখার জন্য কতটা মরিয়া পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল, তা মাঠের খেলা শুরু হওয়ার আগেই স্পষ্ট হয়ে গেল। আমেরিকার বিলাসবহুল কোনো রিসোর্টে ফুটবলাররা যাতে প্রমোদ ভ্রমণের আমেজে গা ভাসিয়ে না দেন, সেজন্য ফুটবলারদের দৈনন্দিন রুটিনে এক কড়া ও নজিরবিহীন ‘মিলিটারি’ শাসন জারি করতে যাচ্ছে ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন।
খেলোয়াড়দের আচরণ, প্রযুক্তির ব্যবহার, পরিবারের সাথে দেখা করার সময় থেকে শুরু করে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, সব কিছুকে এক কঠোর নিয়মের বেড়াজালে বেঁধে ফেলেছেন হেড কোচ কার্লো আনচেলত্তি। উত্তর আমেরিকার (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকো) তপ্ত মাঠে এক দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর মিশন চলার সময় ফুটবলাররা যাতে নিজেদের ফোকাস বিন্দুমাত্র না হারান, সেজন্যই এই ‘কন্ট্রোলড এনভায়রনমেন্ট’ বা নিয়ন্ত্রিত পরিবেশের নীল নকশা।
গত ১৮ মে আনচেলত্তি তাঁর ২৬ সদস্যের চূড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করার পর থেকেই পর্দার আড়ালে এই মহাযজ্ঞের প্রস্তুতি শুরু হয়। সিবিএফের মাস্টারপ্ল্যানের সবচেয়ে চটকদার অংশ হলো, ফুটবলারদের জন্য তৈরি করা একটি বিশেষ ‘আচরণ বিধিমালা’ বা ম্যানুয়াল। এই নিয়ম অনুযায়ী, টুর্নামেন্ট মোড চালু হওয়া মাত্রই ফুটবলারদের মোবাইল ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা ও সীমাবদ্ধতা জারি করা হবে। বাইরের দুনিয়ার ট্রল, সমালোচনা বা কোনো ধরণের আলোচনা যাতে ফুটবলারদের মাথায় ঢুকে মনোযোগ নষ্ট না করে, সেজন্যই এই ডিজিটাল ডিটক্সের ব্যবস্থা।
ফুটবলারদের বিনোদনের জন্য পরিবারের সান্নিধ্যের অনুমতি দেওয়া হলেও, সেখানেও বসানো হয়েছে নিয়মের কাঁটাতার। খেলোয়াড়দের স্ত্রী, সন্তান বা পরিবারের সদস্যরা দলের সাথে একই হোটেলে থাকতে পারবেন না। তাঁদের জন্য সম্পূর্ণ আলাদা হোটেলের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং ম্যাচ দেখার জন্য তাঁদেরকে নির্দিষ্ট টিকিট বরাদ্দ দেওয়া হবে। কেবল ম্যাচের পরের দিন ফুটবলারদের জন্য বিশ্রামের পাশাপাশি পরিবারের সাথে দেখা করার একটা নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া হবে।
এছাড়া, নিউ জার্সির বাস্কিং রিজের ‘দ্য রিজ হোটেল’, যা ব্রাজিলের বেস ক্যাম্প হিসেবে নির্ধারিত হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বুকড করে রাখা হয়েছে। সেখানে খেলোয়াড় ও অফিশিয়ালদের প্রতিনিধিদল ছাড়া বাইরের কোনো সাধারণ মানুষের প্রবেশাধিকার থাকবে না। এমনকি মরিসটাউনের কলাম্বিয়া পার্ক ট্রেনিং সেন্টারে ব্রাজিলের প্র্যাকটিস সেশনগুলোর বেশিরভাগই হবে সম্পূর্ণ রুদ্ধদ্বার বা ক্লোজড ডোর। কোনো সাধারণ দর্শক বা মিডিয়া সেখানে সহজে গলতে পারবে না এবং পুরো ক্যাম্পের চারপাশে থাকবে পুলিশের কড়া ও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়।
শুধু নিয়মকানুনেই নয়, প্রযুক্তির দিক থেকেও এবার এক অবিশ্বাস্য সেটআপ নিয়ে নামছে সেলেসাওরা। ফুটবলারদের পেশির ক্লান্তি এবং চোটের ওপর নজর রাখতে উন্নত মানের স্ক্যানার, সেন্সর এবং হাই-পারফরম্যান্স ফিটনেস ইকুইপমেন্ট ব্যবহার করা হবে। খেলোয়াড়দের ডায়েট এবং পুষ্টির দিকে নজর রাখতে দলের সাথে থাকছেন ব্রাজিলের নিজস্ব ভিভিআইপি শেফ বা বাবুর্চি, যিনি ফুটবলারদের মুখের স্বাদ আর এনার্জির ভারসাম্য বজায় রাখবেন।
ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৪৮টি দলের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া বিশ্বকাপে ‘গ্রুপ সি’ তে থাকা ব্রাজিল আগামী ১৩ জুন নিউ জার্সির মাঠে মরক্কোর বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে। এরপর গ্রুপ পর্বের বাকি দুই ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ হাইতি ও স্কটল্যান্ড। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই ব্রাজিলের এই রাজকীয় ও কঠোর প্রস্তুতি দেখে বোঝাই যাচ্ছে, ফুটবল এখন আর শুধু ৯০ মিনিটের খেলা নয়, ট্রফি জিততে হলে মাঠের বাইরের জীবনটাকেও লোহার খাঁচায় বন্দি করতে হয়!