বিশ্বকাপের মাঠ তৈরিতে কোটি কোটি ডলারের ‘ঘাস যুদ্ধ’

আগামী ১৩ জুন থেকে যখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী বিশ্বকাপের মহারণ দেখার জন্য টিভি পর্দায় চোখ রাখবেন, তখন তাঁরা শুধু খেলোয়াড়দের পায়ের জাদু দেখছেন না; বরং প্রত্যক্ষ করবেন বিশ্বের এক অন্যতম সেরা বৈজ্ঞানিক ও কৃষিযজ্ঞের চূড়ান্ত ফসলকে। ফুটবলাররা মাঠে নামার আগে মাঠের ঘাস প্রস্তুত করতে খেলোয়াড়দের মতোই দিন-রাত ঘাম ঝরছেন একদল বিজ্ঞানী, কৃষক এবং সবুজ মাঠ বিশেষজ্ঞরা।

কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র এবং মেক্সিকো- এই তিন দেশের ১৬টি স্টেডিয়ামে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন জলবায়ুতে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এবারের বিশ্বকাপ। আর এই মহাদেশীয় মহাযজ্ঞই এখন আধুনিক ঘাস বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। বিজ্ঞানীদের মূল লক্ষ্য হলো এমন এক জীবন্ত সবুজ গালিচা তৈরি করা, যা খেলোয়াড়দের বুটের ধারালো স্পাইক বা স্টাডের আঘাত, ট্যাকলিং এবং উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মের তীব্র তাপদাহ সহ্য করেও পুরোপুরি অক্ষত ও সতেজ থাকবে।

World Cup grass 04
বিশ্বমানের ঘাস তৈরির নেপথ্য বিজ্ঞান:
কানাডার ভ্যাঙ্কুভার স্টেডিয়ামে মোট সাতটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। এই স্টেডিয়ামের পিচ বা মাঠের ঘাস প্রস্তুত করার দায়িত্বে রয়েছে বিশেষজ্ঞ টার্ফ চাষী বার্ট বসের পারিবারিক খামার। বিষয়টি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা উল্লেখ করে বস বলেন, এখানে ভুলের কোনো সুযোগ নেই। এটি অত্যন্ত উচ্চ ঝুঁকির কাজ এবং আমরা কোনো ধরনের ব্যর্থতা বরদাস্ত করব না।

একই ধরণের উত্তেজনা ও তাগিদ কাজ করছে ঘাস বিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রিধারী লিয়া ব্রিলম্যানের মধ্যেও। তিনি বিশ্বখ্যাত ঘাস বীজ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ‘ডিএলএফ’-এর সিনিয়র ম্যানেজার। ২০১০ সালের দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বকাপ থেকে মাঠের ঘাস তৈরির সাথে যুক্ত ব্রিলম্যান বলেন, মানুষ যতটা সহজ মনে করে, মাঠের ঘাস প্রস্তুত করার প্রক্রিয়াটি আসলে তার চেয়ে অনেক বেশি জটিল।

স্টেডিয়ামগুলোর ভৌগোলিক অবস্থান ও আবহাওয়া অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন জাতের ঘাস ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন তীব্র গরমের শহরগুলোতে ‘বারমুডাগ্রাস’ এই জাতীয় ঘাসের মিশ্রণ ব্যবহার করা হচ্ছে, যা উচ্চ তাপমাত্রা সহ্য করতে পারে। অন্য দিকে, ভ্যাঙ্কুভার বা মেক্সিকো সিটির মতো অপেক্ষাকৃত শীতল ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের স্টেডিয়ামগুলোতে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘রাইগ্রাস’ মিশ্রণ, যা ঠাণ্ডা আবহাওয়াতেও চমৎকারভাবে মানিয়ে নেয়।

World Cup grass 03
বিশেষ ঘাসের জন্য বিশেষ কৃষক ও কঠিন পরীক্ষা:
কানাডার ম্যানিটোবা প্রদেশের এক ক্ষুদ্র কৃষক লোর্ন বাউন্ডি নিজের এলাকা থেকে উৎপাদিত রাইগ্রাস বীজ বিশ্বকাপে ব্যবহার হওয়া নিয়ে বেশ গর্বিত। এই বিশেষ জাতের ঘাসগুলো হুট করে তৈরি হয়নি, বরং ফিফার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে দীর্ঘ কয়েক দশকের অ্যাকাডেমিক ও বাণিজ্যিক গবেষণা এবং কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগের ফসল। প্রতিটি নতুন প্রজন্মের সাথে এই ঘাসের জাত উন্নত করা হচ্ছে, যাতে এগুলো কম জল ও সারেও রোগবালাই এবং আগাছা প্রতিরোধ করে আরও শক্তপোক্ত হয়ে বেড়ে উঠতে পারে।

ভ্যাঙ্কুভারের মাঠের জন্য প্রস্তুত করা বিশেষ ঘাসটি প্লাস্টিকের স্তরের ওপর অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চাষ করা হয়েছে, যার শিকড়গুলো মাটির নিচে আড়াআড়িভাবে ছড়িয়ে পড়ে এবং ঘাসের ব্লেড বা পাতাগুলো একটি জাল সদৃশ কাপড়ের মধ্য দিয়ে সোজা হয়ে ওপরের দিকে ওঠে। এই টার্ফ বা ঘাস তৈরির মানদণ্ড এতটাই কঠোর যে, প্রতি তিন মিটার দৈর্ঘ্যে ঘাসের উচ্চতার তারতম্য মাত্র ৫ মিলিমিটার পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য।

World Cup grass 02
মাঠের স্থায়িত্ব পরীক্ষা করার জন্য একটি ‘কৃত্রিম পা’ ব্যবহার করা হয়, যা একজন ফুটবলারের তীব্র গতির দৌড় ও ঘোরার সময় পায়ের চাপের অনুকরণে ঘাসকে পরীক্ষা করে। ব্রিলম্যান জানান, আমেরিকান ফুটবল বা রাগবি খেলার মাঠের ঘাস ফুটবলে ব্যবহার করা যায় না। কারণ ফুটবলে গোলপোস্টের সামনের অংশে খেলোয়াড়দের উপচে পড়া ভিড় এবং বারবার বুটের আঘাতে মাঠের চামড়া উঠে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই ওই অংশগুলোতে সার্বক্ষণিক নতুন বীজ বুনে সতেজ রাখতে হয়। তাছাড়া কিছু স্টেডিয়ামের কৃত্রিম ঘাসের ওপর এই আসল বা প্রাকৃতিক ঘাসের আস্তরণ বসানো অন্যতম এক বড় চ্যালেঞ্জ ছিল।

World Cup grass 01
বিশেষজ্ঞদের মূল লক্ষ্য একটাই,মাঠ যেন এতটাই নিখুঁত হয় যে খেলার সময় কেউ যেন ঘাসের দিকে  আলাদা করে নজর দেয়ার সুযোগ না পায়। ২০২৩ সালের আমেরিকান সুপার বোলে মাঠের ঘাস পিচ্ছিল হওয়ার কারণে খেলোয়াড়দের সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছিল আয়োজকদের। বিশ্বকাপে তেমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়াতেই এবার কোমর বেঁধে নেমেছেন বিজ্ঞানীরা। ঘাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থার ম্যানেজার টম রিন আনন্দের সাথে বলেন, বন্ধুদের সাথে বসে যখন বিশ্বকাপের ম্যাচ দেখব, তখন বুক ফুলিয়ে বলতে পারব, এই যে মাঠের সবুজ ঘাস দেখছিস, এটা আমাদের হাত দিয়েই তৈরি হয়েছে।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স