ফুটবল বিশ্বকাপে জয়-পরাজয়ের আগাম পূর্বাভাস দেওয়ার জন্য এক সময় জার্মানির সেই বিখ্যাত আট পাওয়ালা জলজ জ্যোতিষী ‘পল অক্টোপাস’-এর ওপর চোখ বুজে ভরসা করত ফুটবল বিশ্ব। কিন্তু যুগ বদলেছে, এসেছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর মেশিন লার্নিংয়ের জোয়ার।
আর এই জমানায় বিশ্বকাপের ট্রফি কার ঘরে যাচ্ছে, তা গণনার পদ্ধতি হয়ে উঠেছে আরও নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক। ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মেগা বিশ্বকাপ শুরুর প্রাক্কালে অস্ট্রিয়ার ইন্সব্রুক বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যানের অধ্যাপক আখিম জাইলাইস তাঁর বিশেষ ‘মাস্টার এলগরিদম’ দিয়ে জানিয়ে দিলেন, এবার কার মাথায় উঠতে যাচ্ছে বিশ্বসেরার মুকুট। আর, সেই তালিকায় বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার স্থান কিন্তু মোটেও সুবিধার নয়!
অধ্যাপক জাইলাইস তাঁর মেশিন লার্নিং অ্যালগরিদম এবং জটিল গাণিতিক মডেলের মাধ্যমে লাখো তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে এই ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন। এই প্রক্রিয়ার জন্য তিনি পুরো টুর্নামেন্টটিকে কম্পিউটারের পর্দায় এক লাখ বার সিমুলেশন বা কাল্পনিকভাবে খেলিয়ে দেখেছেন।
আর সেই লাখো ম্যাচের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এবারের বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় ফেভারিট দল হলো স্পেন! স্প্যানিশদের ট্রফি জেতার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি, প্রায় ১৪.৫%। স্পেনের ঠিক পেছনেই ১২.৪% সম্ভাবনা নিয়ে যৌথভাবে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড এবং কিলিয়ান এমবাপের ফ্রান্স। এছাড়া স্বাগতিকদের চেনা কন্ডিশনে জার্মানির ট্রফি ছোঁয়ার সম্ভাবনা ১১.২%।
সমর্থকদের রক্তচাপ বাড়িয়ে দিয়ে এই এআই মডেল জানাচ্ছে, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর পর্তুগাল (৮.৯%) এবং লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনার (৮.২%) এবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সম্ভাবনা বড্ড ক্ষীণ। অর্থাৎ, ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ডেটা সায়েন্স বলছে, লাতিন আমেরিকার দাপট ভেঙে এবার ইউরোপেরই কোনো পরাশক্তি ট্রফি নিয়ে বাড়ি ফিরবে।
মজার বিষয় এআই ব্রাজিলকে গণনাতেই ধরেনি। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট’-এ অধ্যাপক জাইলাইস ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে তাঁর এই ‘ডিজিটাল জ্যোতিষী’ কাজ করে। এই ভবিষ্যদ্বাণীর পেছনে মূলত দুটি প্রধান ধাপ এবং চারটি বিশেষ ভ্যারিয়েবল বা চলক কাজ করেছে:
বিগত আট বছরের পারফরম্যান্স: গত আট বছর ধরে আন্তর্জাতিক ফুটবলে কোন দল কেমন খেলেছে, তার একটি ‘অতীত পর্যালোচনা’ করা হয়েছে।
বাজিকরদের চোখ: আন্তর্জাতিক বাজিকরদের দেয়া দর বা অডস বিশ্লেষণ করে দলগুলোর ‘ভবিষ্যত সম্ভাবনা’ পরিমাপ করা হয়েছে।
খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত গোল-অ্যাসিস্ট: ক্লাব ও জাতীয় দলের জার্সিতে প্রতিটি খেলোয়াড়ের গোল এবং অ্যাসিস্টের ডেটা নিখুঁতভাবে মাপা হয়েছে।
মার্কেট ভ্যালু বা বাজারমূল্য: বিখ্যাত ‘ট্রান্সফারমার্কেট’ ওয়েবসাইট থেকে খেলোয়াড়দের বর্তমান বাজারমূল্য এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে যুক্ত করা হয়েছে।
গণমাধ্যমের প্রতিক্রিয়া: মানুষের বুদ্ধিমত্তা আর জুয়াড়িদের এক্সপার্ট ওপেনিয়নকে একসাথে গুলিয়ে তৈরি এই ককটেল অ্যালগরিদম মাঠের বাইরের ফুটবল কূটনীতিতে বড়সড় তোলপাড় ফেলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, কম্পিউটারের এই চতুর হিসাবকে ভুল প্রমাণ করে মেসি বা রোনালদোরা তাঁদের ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে কোনো রূপকথা লিখতে পারেন, নাকি এআই-এর গণনা মেনে স্প্যানিশ সাম্বার জোয়ারে ভেসে যাবে এবারের বিশ্বকাপ!