ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসে এর চেয়ে বড় বৈপরীত্যের ম্যাচ আর হতেই পারে না! একদিকে চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফুটবল পরাশক্তি জার্মানি, আর অন্যদিকে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম দেশ ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের কুরাসাও। আয়তন এবং জনসংখ্যা, উভয় দিক থেকেই বিশ্বকাপের মূল পর্বে পা রাখা ইতিহাসের সবচেয়ে ছোট এই দেশটিকে নিয়ে যখন ই-গ্রুপের উদ্বোধনী ম্যাচে একচেটিয়া একপেশে লড়াইয়ের পূর্বাভাস দিচ্ছে সবাই, তখনই ফুটবলবিশ্বে এক পশলা রোমাঞ্চের হাওয়া বইয়ে দিয়েছেন কুরাসাওয়ের বর্ষীয়ান ডাচ কোচ ডিক অ্যাডভোকাট। ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায়।
৭৮ বছর বয়সী এই মাস্টারমাইন্ডের অধীনে কুরাসাও ড্রেসিংরুমে এখন শান্ত কিন্তু ইস্পাতকঠিন আত্মবিশ্বাসের সুর। ম্যাচ শুরুর আগে জার্মানদের প্রচ্ছন্ন হুঁশিয়ারি দিয়ে অ্যাডভোকাট বলেন, জার্মানির বিরুদ্ধে আমাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু হচ্ছে, এটা আমাদের জন্য দারুণ এক ব্যাপার। প্রথম ম্যাচেই আমরা বুঝে যাব আমরা ঠিক কোন জায়গায় দাঁড়িয়ে আছি। আমরা পরের রাউন্ডে যেতে চাই এবং ফুটবলে অঘটন সবসময়ই সম্ভব। আমাদের কোনো সুযোগ নেই, এমনটা ভাবলে ভুল হবে। দলের সবার মধ্যে জেদ আছে, আর জেদ থাকলে অনেক কিছু অর্জন করা সম্ভব।
নেদারল্যান্ডস রাজ্যের একটি অংশ কুরাসাও। এই ম্যাচের ঝাঁঝ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে একটি বিশেষ সত্য, কুরাসাও দলের একজন ছাড়া বাকি সব খেলোয়াড়ই জন্মসূত্রে ইউরোপে, বিশেষ করে নেদারল্যান্ডসে বড় হয়েছেন। ফলে জার্মানি ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার ফুটবল ইতিহাসের সেই চিরন্তন বৈরিতা ও বারুদ এই ম্যাচেও ছড়াতে বাধ্য।
কুরাসাওয়ের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ইলোয় রুম জার্মান গণমাধ্যম বিল্ডকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, জার্মানির জন্য এই ম্যাচটি আসলে ‘নেদারল্যান্ডস পার্ট-২’ বা মিনি ডাচ দলের বিরুদ্ধে খেলার মতো। কারণ আমাদের প্রায় সব খেলোয়াড়ই নেদারল্যান্ডসে জন্মেছে। এই সমীকরণটি মাঠের লড়াইয়ে এক অন্যরকম উত্তেজনা আর শত্রুতার আবহ তৈরি করেছে, যা আমাদের জানপ্রাণ দিয়ে খেলার বাড়তি অনুপ্রেরণা জোগাচ্ছে।
কাগজে-কলমে সব চাপ এখন জার্মানির ওপর। ২০১৮ এবং ২০২২- টানা দুটি বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে লজ্জাজনক বিদায়ের পর এবার নিজেদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে মরিয়া ‘ডাই মানশাফট’রা। যদিও ফুটবল বোদ্ধারা স্পেন, ফ্রান্স কিংবা আর্জেন্টিনার তুলনায় জার্মানিকে কিছুটা পিছিয়ে রাখছেন, তবে দলটির ডিরেক্টর এবং বিশ্বকাপজয়ী কিংবদন্তি রুডি ফোলার হুঙ্কার ছেড়ে বলেছেন, আমরা হয়তো এই মুহূর্তের শীর্ষ তিন-চারটি হট-ফেভারিটের তালিকায় নেই। কিন্তু প্রথম ম্যাচ জেতার গুরুত্ব আমরা খুব ভালো করেই জানি। আমরা এখানে এসেছি এবং এমন একটা দল হতে চাই যাদের হারানো অসম্ভব। গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়েই আমরা নকআউটে যাব, এ নিয়ে কোনো তর্কের অবকাশ নেই। প্রস্তুতি ম্যাচে ফিনল্যান্ড এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে হারিয়ে বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে ইউলিয়ান নাগেলসম্যানের দল।
জার্মান শিবিরে সবচেয়ে বড় স্বস্তির খবর হলো, বেশ বিতর্ক তৈরি করে স্কোয়াডে ডাক পাওয়া বায়ার্ন মিউনিখের কিংবদন্তি গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়ার তাঁর কাফের চোট কাটিয়ে প্রথম ম্যাচেই গ্লাভস হাতে পোস্টের নিচে দাঁড়াচ্ছেন। অন্যদিকে কুরাসাও দলে কোনো চোটের সমস্যা নেই, পূর্ণ শক্তির দল নিয়েই ইতিহাস গড়তে নামছে তারা।
ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে ইতালির সাথে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ চার বার বিশ্বকাপ জিতেছে জার্মানি (একমাত্র ব্রাজিল জিতেছে পাঁচ বার)। এটি জার্মানদের ২১তম বিশ্বকাপ অংশগ্রহণ, যা ইউরোপের মধ্যে সর্বোচ্চ। কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নিলেও জার্মানির ‘এক্সজি’ বা নিশ্চিত গোলের সুযোগ তৈরির হার ছিল পুরো টুর্নামেন্টে চতুর্থ (১০.১)। প্রতি ৯০ মিনিটে তাদের ৩.৪ এক্সজি ছিল বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ, যা ব্রাজিল (২.২০) এবং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা (২.১৫)-র চেয়েও বেশি ছিল।
অন্যদিকে কনকাকাফ অঞ্চল থেকে ২০১৮ সালে পানামার পর কুরাসাওই প্রথম নবাগত দল। বাছাইপর্বে এই অঞ্চলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ২৮টি গোল করার রেকর্ড গড়েছে তারা। তবে বাঘা বাঘা ফুটবল বিশ্লেষকদের মতে, রোমাঞ্চ যতই থাকুক না কেন, মাঠের শক্তিতে জার্মানির ধারেকাছেও নেই কুরাসাও। এটি হতে যাচ্ছে এই বিশ্বকাপের প্রথম চরম একপেশে ম্যাচ এবং জার্মানি অনায়াসে ৫-০ গোলের ব্যবধানে কুরাসাওকে গুঁড়িয়ে দেবে বলেই ফুটবল পণ্ডিতদের অনুমান। এখন দেখার বিষয়, ডাচ কোচের ‘মিনি নেদারল্যান্ডস’ কোনো মিরাকল ঘটাতে পারে কি না!