ম্যাচ শেষে ঝাড়ুদারের ভূমিকায় জাপানি সমর্থকরা!

মাঠের লড়াইয়ে শক্তিশালী নেদারল্যান্ডসের চোখে চোখ রেখে দুই-দুইবার পিছিয়ে পড়েও ২-২ গোলে মহাকাব্যিক ড্র করেছে জাপান। টেক্সাসের আর্লিংটনে এটিঅ্যান্ডটি স্টেডিয়ামে রোববার রাতের সেই রুদ্ধশ্বাস ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই যখন স্টেডিয়ামজুড়ে নীল সামুরাইদের গগনবিদারী উল্লাস, ঠিক তখনই গ্যালারিতে দেখা গেল এক অবিশ্বাস্য দৃশ্য।

উদযাপনের চড়া আমেজ মাড়িয়েই জাপানি সমর্থকরা হাতে তুলে নিলেন বড় বড় নীল রঙের পলিথিন ব্যাগ। ব্যস, মুহূর্তের মধ্যেই হাজারো দর্শক বনে গেলেন একেকজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী! গ্যালারিতে পড়ে থাকা পানির বোতল, চিপস ও খাবারের মোড়কসহ সমস্ত আবর্জনা নিজেরাই কুড়িয়ে পরিষ্কার করে আবারও পুরো বিশ্বের মন জয় করে নিয়েছেন জাপানের ফুটবলপ্রেমীরা।

Japani Supporter 03
সাধারণত হাইভোল্টেজ ম্যাচের পর যেখানে স্টেডিয়ামের গ্যালারিগুলোকে আবর্জনার ভাগাড় বানিয়ে দর্শকরা বাড়ি ছোটেন, আর পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের দিনভর বেগ পেতে হয়, সেখানে জাপানিদের এই অনন্য শৃঙ্খলা, সচেতনতা আর দায়িত্ববোধ দেখে বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীরা প্রশংসায় পঞ্চমুখ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বইছে তাঁদের কুর্নিশ জানানোর ঝড়।

জাপান ও নেদারল্যান্ডসের মধ্যকার এই ম্যাচে রোমাঞ্চ আর উত্তেজনার পারদ ছিল আকাশচুম্বী। র‍্যাঙ্কিংয়ে যোজন যোজন এগিয়ে থাকা ডাচদের ডেরায় হানা দিয়ে প্রথমার্ধে গোলশূন্য সমতা ধরে রাখে ব্লু সামুরাইরা। তবে আসল নাটক জমা ছিল দ্বিতীয়োর্ধের জন্য। ৫১ থেকে ৬৪—এই মাত্র ১৩ মিনিটের ঝড়ে মাঠে গোল হয় তিনটি! ৫১ মিনিটে ডাচরা লিড নিলেও মাত্র ৬ মিনিটের ব্যবধানে গোল শোধ করে ম্যাচে ফেরে জাপান।

Japani Supporter 02
৬৪ মিনিটে ডাচ উইঙ্গার ক্রিসেনসিও সামারভিলের দুর্দান্ত এক গোলে আবারও ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় নেদারল্যান্ডস। ঘড়ির কাঁটা যখন ৮৮ মিনিট ছুঁয়েছে, ডাচ ড্রেসিংরুম তখন নিশ্চিত জয়ের উৎসবে মাতোয়ারা। কিন্তু নাটকের তখনও শেষ অঙ্ক বাকি ছিল!

৮৯ মিনিটে কোকি ওগাওয়ার মাপা কর্নার কিক থেকে বাঘের মতো লাফিয়ে উঠে বুলেট হেডে গোল করে ডাচদের জয় কেড়ে নেন দাইচি কামাদা। ২-২ গোলের এই অবিশ্বাস্য সমতার পর পুরো স্টেডিয়ামে জাপানি গ্যালারি যেন এক জীবন্ত আগ্নেয়গিরিতে রূপ নেয়।

সবচেয়ে বড় চমকটি অপেক্ষা করছিল ম্যাচের ঠিক পরপরই। বাঁধভাঙা আনন্দের জোয়ারেও জাপানিরা ভুলে যাননি তাঁদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। ম্যাচ শেষ হতেই পকেট থেকে নীল ব্যাগ বের করে সারিবদ্ধভাবে পুরো স্টেডিয়ামের ময়লা পরিষ্কার করতে শুরু করেন তাঁরা।

Japani Supporter 01
জাপানি সমর্থকদের গ্যালারি সাফ করার এই অনন্য নজির কিন্তু এবারই প্রথম নয়। বিশ্বমঞ্চে তাঁদের এই অসাধারণ সংস্কৃতির প্রথম দেখা মিলেছিল ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপে। এরপর থেকে প্রতিটি বিশ্বকাপেই ম্যাচ শেষে গ্যালারি পরিষ্কার করাকে নিজেদের কর্তব্যের অংশ বানিয়ে নিয়েছেন তাঁরা।

২০১৮ সালে রাশিয়া বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের কাছে শেষ মুহূর্তের গোল খেয়ে হৃদয়বিদারক পরাজয়ের পরও ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে স্টেডিয়াম পরিষ্কার করেছিলেন এই জাপানিজরা, যা দেখে চোখ ভিজেছিল ফুটবল বিশ্বের। এরপর ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও তারা একই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিলেন। এবার ২০২৬ সালের উত্তর আমেরিকার মেগা বিশ্বকাপেও তার ব্যতিক্রম হলো না। মাঠের ফুটবল দিয়ে ডাচদের রুখে দেয়ার পাশাপাশি মাঠের বাইরের আচরণে আরও একবার বিশ্বসেরার মুকুট জিতে নিলেন জাপানের ফুটবল ভক্তরা!