কাতার বিশ্বকাপের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি ফুটবলপ্রেমীরা নিশ্চয়ই ভুলে যাননি, যেখানে প্রথম ম্যাচেই লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনাকে ২-১ গোলে হারিয়ে বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল সৌদি আরব। আর্জেন্টিনা সেই ধাক্কা সামলে শেষ পর্যন্ত ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেও, এবার এইচ-গ্রুপের উদ্বোধনী ম্যাচে সৌদির মুখোমুখি হওয়ার আগে রীতিমতো কাঁপছে উরুগুয়ে।ম্যাচটি শুরু হবে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার ভোর ৪টায়।
কাতার বিশ্বকাপে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেওয়ার লজ্জাজনক ক্ষতে প্রলেপ দিতে এবার শুরু থেকেই জয়ে চোখ উরুগুয়ের। কিন্তু প্রথম প্রতিপক্ষ যখন ‘পরাশক্তি-হত্যাকারী’ সৌদি আরব, আর এই গ্রুপে যখন ফেভারিট হিসেবে ওত পেতে আছে স্পেন, তখন এক ইঞ্চি ভুল করারও কোনো সুযোগ নেই লাতিন আমেরিকার দলটির সামনে।
কাগজে-কলমে উরুগুয়ে এগিয়ে থাকলেও বর্তমান ফর্ম কিন্তু তাদের পক্ষে কথা বলছে না। নিজেদের শেষ চার ম্যাচের একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি মার্সেলো বিয়েলসার দল; যার মধ্যে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৫-১ গোলের এক লজ্জাজনক ধোলাই।
শেষ ৭টি ম্যাচের মধ্যে মাত্র একবার তারা একের বেশি গোল করতে পেরেছে। তার ওপর দলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা লুইস সুয়ারেজকে স্কোয়াড থেকে ছেঁটে ফেলে ব্যাপক গণ-সমালোচনার মুখে পড়েছেন কোচ বিয়েলসা। সাবেক বার্সেলোনা ও লিভারপুল তারকা সুয়ারেজ খোদ কোচের কোচিং পদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্যে বিষোদগার করেছিলেন, যার খেসারত দিতে হয়েছে দল থেকে বাদ পড়ে।
ইতিহাস বলছে, আর্জেন্টিনা ও চিলির পর তৃতীয় লাতিন দল হিসেবে উরুগুয়ের দায়িত্ব নিয়ে নিজের তৃতীয় বিশ্বকাপে পা রেখেছেন বিয়েলসা। তবে তাঁর অধীনে দলগুলো বিশ্বকাপে কখনো এক ম্যাচে একের বেশি গোল করতে পারেনি! সুয়ারেজ না থাকায় এবার গোলের সমস্ত ভার বইতে হবে লিভারপুল তারকা দারউইন নুনিয়েসকে, যিনি ল্যাটিন অঞ্চলের বাছাইপর্বে সর্বোচ্চ ৭টি গোলে (৫ গোল, ২ অ্যাসিস্ট) সরাসরি অবদান রেখেছিলেন। পাশাপাশি মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে রিয়াল মাদ্রিদ তারকা ফেদেরিকো ভালভার্দের পায়ে।
ম্যাচের আগে উরুগুয়ে শিবিরে সবচেয়ে বড় মাথা ব্যথার কারণ তাদের প্রধান ডিফেন্ডারদের চোট। গোড়ালির চোটে হোসে গিমেনেস, কাফের ইনজুরিতে রোনাল্ড আরাউহো ও জর্জিয়ান ডি আরাসকায়েতা, পেশির টানে মাতিয়াস ভিনিয়া এবং মাথার চোটের কারণে সেবাস্তিয়ান ক্যাসেরেস, সবাই আজ অনিশ্চিত।
অন্যদিকে সৌদিও খুব একটা সুবিধাজনক অবস্থায় নেই। ২০২৬ সালে এ পর্যন্ত খেলা ম্যাচগুলোর মধ্যে পুয়ের্তো রিকোর বিপক্ষে একমাত্র জয়টি বাদে বাকি ম্যাচগুলোতে শুধুই দুই গোল করতে পেরেছে তারা।
যদিও শেষ প্রস্তুতি ম্যাচে শক্তিশালী সেনেগালের সাথে ০-০ গোলে ড্র করে তাদের আত্মবিশ্বাস কিছুটা বেড়েছে, তবে ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে উরুগুয়ের কাছে ১-০ গোলের হারের প্রতিশোধ নেয়ার মতো রসদ এবার তাদের শিবিরে কমই দেখা যাচ্ছে। এর ওপর ইনজুরির কারণে আজ পোস্টের নিচে থাকছেন না সৌদির নিয়মিত গোলরক্ষক নাওয়াফ আল-আকিদি।
বিশ্বকাপের মঞ্চে সৌদির রেকর্ড অত্যন্ত মলিন। বিশ্বমঞ্চে খেলা নিজেদের ১৯টি ম্যাচের মধ্যে ১৩টিতেই হেরেছে তারা। তাছাড়া ১৯৯৪ সালের বিশ্বকাপে বেলজিয়ামের বিপক্ষে ১-০ গোলের সেই ঐতিহাসিক জয়ের পর আজ পর্যন্ত বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচেই ক্লিন শিট (গোল না খাওয়া) রাখতে পারেনি গ্রিন ফ্যালকনরা।
তবে স্বস্তিতে নেই উরুগুয়েও। নিজেদের শেষ আটটি বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের মধ্যে মাত্র একটিতে জিতেছে তারা (৪ ড্র, ৩ হার)।
ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, উরুগুয়ে এই মুহূর্তে গোল খরায় ভুগলেও এবং রক্ষণে ইনজুরির ধাক্কা থাকলেও, সৌদি আরবকে বধ করার মতো যথেষ্ট বারুদ নুনিয়েস-ভালভার্দেদের পায়ে রয়েছে।
২০১৮ সালের মতো এবারও রক্ষণাত্মক ফুটবলের এক চরম স্নায়ুযুদ্ধ দেখা যেতে পারে, যেখানে ১-০ গোলের একটি কষ্টার্জিত জয় নিয়ে মাঠ ছাড়তে পারে উরুগুয়ে। আর যদি সৌদি আরব আবারও কোনো অঘটন ঘটিয়ে বসে, তবে কোচ বিয়েলসার চাকরি যে সুতোয় ঝুলবে, তা নিশ্চিত!