ফুটবল বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে এমন নজিরবিহীন এবং রোমাঞ্চকর ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি! এই প্রথম বিশ্বকাপের কোনো আয়োজক দেশ এমন এক ফুটবল দলকে স্বাগত জানাল, যাদের দেশের সাথে তারা নিজেরা সরাসরি যুদ্ধক্ষেত্রে লিপ্ত। সব রাজনৈতিক বৈরিতা, হামলা আর কূটনৈতিক যুদ্ধকে একপাশে সরিয়ে রেখে বিশ্বকাপে অংশ নিতে অবশেষে আমেরিকার মাটিতে পা রাখল ইরান ফুটবল দল।
রোববার, লস অ্যাঞ্জেলেস বিমানবন্দরে যখন ‘টিম মেল্লি’র পা পড়ে, ঠিক তখনই কাকতালীয়ভাবে দুই দেশের মধ্যে একটি ঐতিহাসিক শান্তিচুক্তির ঘোষণা আসে। সোমবার সকালে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে ম্যাচ দিয়ে নিজেদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে ইরান। তবে মাঠের ফুটবলের চেয়েও এই ম্যাচকে ঘিরে তৈরি হওয়া রাজনৈতিক উত্তাপ পুরো বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।
চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শেষদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল যৌথভাবে ইরানে সামরিক হামলা চালানোর পর ইরান দল তাদের বিশ্বকাপ বেস ক্যাম্প অ্যারিজোনা থেকে সরিয়ে মেক্সিকোর টিজুয়ানায় নিয়ে গিয়েছিল। রোববার সেখান থেকে বিদায় নেওয়ার সময় এক আবেগঘন মুহূর্তের সৃষ্টি হয়।
মেক্সিকান সমর্থকরা হোটেলের বাইরে জড়ো হয়ে ফার্সি ভাষায় ‘টিম মেল্লি’ বলে চিৎকার করতে থাকেন। এক সমর্থকের প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, ইরান, তোমরা কখনো একা নও। মেক্সিকো তোমাদের পাশে আছে। স্প্যানিশ ভাষায় স্লোগান ওঠে, ইরান ভাই, তোমরা এখন মেক্সিকান!
তবে আমেরিকার মাটিতে পা রেখে সংবাদ সম্মেলনে ক্ষোভ ও কষ্টের কথা লুকিয়ে রাখেননি ইরানের কোচ আমির ঘালিনোই। মেক্সিকো থেকে প্রতি ম্যাচের জন্য আমেরিকায় যাতায়াতের ধকল এবং ইরান ফুটবল ফেডারেশনের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে মার্কিন সরকারের ভিসা না দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ভিসা প্রত্যাখ্যান এবং এই দীর্ঘ ভ্রমণ আমাদের দলের ওপর মানসিক ও নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তবে আমি অত্যন্ত গর্বিত যে আমি একটি শক্তিশালী ও মহান জাতির প্রতিনিধিত্ব করছি। আশা করি ফুটবল সংস্কৃতির দূরত্ব ঘুচিয়ে দুই দেশকে কাছাকাছি আনবে।
উল্লেখ্য, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিশ্চিত করেছেন যে, আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে এক আনুষ্ঠানিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দুই দেশের এই যুদ্ধ সমাপ্তির শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরিত হবে।
ইরান দল যখন লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছায়, তখন স্টেডিয়ামের বাইরে জড়ো হন হাজারো প্রবাসী ইরানি বিক্ষোভকারী। ইরানের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগানে উত্তাল হয়ে ওঠে ইংলেউডের রাস্তা। বিক্ষোভকারীদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, ইরানে কোনো শাহ বা মোল্লাতন্ত্র চলবে না, ইরানিদের দ্বারাই শাসন পরিবর্তন চাই। গত জানুয়ারি মাসে ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলনে নিহত অ্যাথলেটদের ছবি ও পোস্টার দিয়ে সাজানো হয়েছিল রাস্তা।
বিক্ষোভে অংশ নেয়া ৫৬ বছর বয়সী ইরানি-আমেরিকান মোজগান রামেযানী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ওরা (ইরান সরকার) নিজেদের দেশের মানুষকে জিম্মি করে রেখেছে। ৭০ বছর বয়সী হাসান হাদ্দাদি হতাশা প্রকাশ করে বলেন,"পশ্চিমা বিশ্ব শুধু মুখে নিন্দা জানায়, কাজের কাজ কিছুই করে না। আমরা চাই এই স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটুক। অবশ্য রাজনৈতিক এই উত্তাপ থেকে নিজেদের দূরে রেখে কোচ ঘালিনোই স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, আমরা কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি নই। আমরা এখানে শুধু ফুটবল খেলতে এসেছি এবং দেশে ও দেশের বাইরে থাকা সমস্ত সম্মানিত ইরানিদের প্রতিনিধিত্ব করছি।"
ইরানের বাইরে সবচেয়ে বেশি ইরানি প্রবাসীর বসবাস এই লস অ্যাঞ্জেলেসেই, যাকে ভালোবেসে অনেকেই ‘তেহরানগেলেস’ বলে ডাকেন। ফলে আজকের ম্যাচে গ্যালারিতে গগনবিদারী সমর্থনের পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রতিবাদের এক চরম মিশেল দেখা যাবে।
বিশ্বকাপের মঞ্চে এর আগে কখনোই নিউজিল্যান্ডের মুখোমুখি হয়নি ইরান। এক ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট, যুদ্ধ বিরতির ঘোষণা এবং স্টেডিয়ামের বাইরের তীব্র বিক্ষোভের মাঝে আজ ‘গ্রুপ জি’-এর এই ম্যাচটি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম নাটকীয় ম্যাচে রূপ নিতে যাচ্ছে। এখন দেখার বিষয়, মাঠের বাইরে এত ঝড় সামলে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয় দিয়ে মাঠ ছাড়তে পারে কি না টিম মেল্লি!