বোস্টনে নরওয়ের হালান্ড বনাম ইরাকের সেট-পিস জাদু

উত্তর আমেরিকার বিশ্বমঞ্চে ভোর ৪টায় বোস্টন স্টেডিয়ামে আই-গ্রুপের এক জমজমাট ও মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছে ইরাক ও নরওয়ে। এই গ্রুপে সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে সবাই টেবিলের শীর্ষস্থানের জন্য ফেভারিট ভাবায়, নকআউটের দ্বিতীয় টিকিটের লড়াইয়ে এই ম্যাচটি দুই দলের জন্যই অলিখিত ফাইনাল। একদিকে দীর্ঘ ৪২ বছর পর ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চে ফিরেছে ইরাকের ‘লায়ন্স অব মেসোপটেমিয়া’, অন্যদিকে সুদীর্ঘ ২৮ বছর (১৯৯৮ সালের পর) পর বিশ্বমঞ্চে ফিরেছে ইউরো উদীয়মান পরাশক্তি নরওয়ে। বোস্টনের সবুজ গালিচায় তাই এক ইঞ্চি জমিও কেউ কাউকে ছাড়বে না, তা নিশ্চিত।

কোচ স্টেল সোলবাকেনের অধীনে নরওয়ে এবার রূপকথার মতো এক বাছাইপর্ব পার করে মূল মঞ্চে পা রেখেছে। ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইপর্বে নিজেদের ৮টি ম্যাচের সব কটিতে জিতে গোলবন্যা বইয়ে দিয়েছিল তারা। ওই ৮ ম্যাচে রেকর্ড ৩৭টি গোল করার বিপরীতে তারা হজম করেছিল মাত্র ৫টি গোল! ম্যাচ প্রতি গড়ে ৪.৬টি গোল করে যে কোনো ইউরোপীয় দেশের মধ্যে এক ক্যাম্পেইনে সর্বোচ্চ গড় গোলের নতুন ইতিহাস লিখেছে ভাইকিংরা। এই আক্রমণের মূল কাণ্ডারি ম্যানচেস্টার সিটির গোলমেশিন আর্লিং হালান্দ, যিনি বাছাইপর্বে একাই করেছেন ১৬টি গোল (প্রতি ৯০ মিনিটে ২.০৪ গোল)!

Norway Team 01
অন্যদিকে, ইরাকের মূল মঞ্চে আসার পথটি ছিল কণ্টকাকীর্ণ। বাছাইপর্বের মাঝপথে কোচ বরখাস্তের পর অভিজ্ঞ ডাচ-অস্ট্রেলিয়ান গুরু গ্রাহাম আর্নল্ডের হাতে দলের দায়িত্ব সঁপে দেয় তারা। শেষ পর্যন্ত আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফে বলিভিয়াকে হারিয়ে টিকিট কাটে ইরাক। তবে টুর্নামেন্টের ঠিক আগে শক্তিশালী স্পেনের সাথে ১-১ প্রীতি ম্যাচে ড্র করে নিজেদের শক্তির জানান দিয়ে রেখেছে এশিয়ার এই প্রতিনিধিরা।

ইরাক আজ মাঠে নামছে তাদের অভিজ্ঞ অধিনায়ক ও ১০৩তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে যাওয়া গোলরক্ষক জালাল হাসানের ওপর ভর করে। রক্ষণভাগে তাকে সুরক্ষা দেবেন জায়েদ তাহসিন এবং রেবিন সুলাকা। মাঝমাঠে বল জোগানোর মূল দায়িত্বে থাকছেন সাবেক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড তারকা জিদান ইকবাল এবং আমির আল-আম্মারি; যিনি এশিয়ান বাছাইপর্বের শেষ রাউন্ডে ইরাকের ৫টি গোলের ৩টিতেই সরাসরি অবদান রেখেছিলেন। আর আক্রমণে কিউই বা ভাইকিংদের ডিফেন্স চূর্ণ করতে ওত পেতে থাকবেন স্ট্রাইকার আইমেন হুসেইন (বাছাইপর্বে ৯ গোল) এবং স্টোক সিটির ফরোয়ার্ড আলী আল-হামাদি।

Iraq Team 01
অন্যদিকে, নরওয়ের আক্রমণের পুরোভাগে চিতার মতো দৌড়াতে প্রস্তুত আর্লিং হালান্দ। তাকে পাস সরবরাহের জন্য মাঝমাঠের সুতো কাটবেন অধিনায়ক ও আর্সেনাল তারকা মার্টিন ওডেগার্ড, স্যান্ডার বার্গ এবং ফ্রেডরিক আউরসনেস। দুই উইং দিয়ে গতিঝড় তুলবেন আন্তোনিও নুসা এবং আতলেতিকো মাদ্রিদের আলেকজান্ডার সরলথ। রক্ষণে ক্রিস্টোফার আয়ারের সাথে দেখা যেতে পারে টরবোয়র্ন হেগেমকে।

বিশ্বকাপের মঞ্চে ইরাকের অতীত ইতিহাস মোটেও সুখকর নয়। ১৯৮৬ সালের বিশ্বকাপে নিজেদের খেলা ৩টি ম্যাচের সবকটিতেই হেরেছিল তারা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে কোনো ম্যাচ না জিতে শতভাগ হারের রেকর্ডে কানাডা ও এল সালভাদরের ঠিক পরেই রয়েছে ইরাক। তবে এশিয়ান বাছাইপর্বে ইরাকের করা ১৫টি গোলের ৮টিই এসেছিল সেট-পিস (৪টি ফ্রি-কিক, ৩টি কর্নার, ১টি পেনাল্টি) থেকে। ফলে, ওডেগার্ডদের ফাউল করার আগে দশবার ভাবতে হবে।

Norway Team 02
অন্যান্য তথ্যে দেখা যায়, ১৯৯৪ সালের যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বকাপেও খেলেছিল নরওয়ে। সেবার গ্রুপের চার দলেরই পয়েন্ট (৪) এবং গোল ব্যবধান (০) সমান হওয়ার এক অদ্ভুত বিশ্বরেকর্ড হয়েছিল, যেখানে কম গোল করার অপরাধে তলানিতে থেকে বিদায় নিয়েছিল নরওয়ে। তবে ১৯৯৮ সালে ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিকে ২-১ গোলে হারিয়ে শেষ ষোলোতে উঠেছিল তারা, যা এখনো কোনো ইউরোপীয় দেশের গ্রুপ পর্বে ব্রাজিলকে হারানোর সর্বশেষ নজির। মজার ব্যাপার হলো, নরওয়ের কোচ সোলবাকেন ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে একজন খেলোয়াড় হিসেবে ৩টি ম্যাচ খেলেছিলেন, আর আজ তিনি ডাগআউটে মাস্টারমাইন্ড।

ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, গ্রাহাম আর্নল্ডের অধীনে ইরাক অনেক গোছানো ফুটবল খেলছে এবং সেট-পিসে তারা নরওয়েকে ভালোই ভোগাবে। তবে হালান্দ, ওডেগার্ড, নুসা এবং সরলথদের নিয়ে গড়া নরওয়ের যে বিধ্বংসী আক্রমণভাগ, তা পুরো ৯০ মিনিট আটকে রাখা ইরাকি ডিফেন্সের পক্ষে অসম্ভব। সব দিক বিবেচনা করে বোস্টনের মাঠে নরওয়ে ৩-১ ব্যবধানে ইরাককে গুঁড়িয়ে দিতে পারে বলেই ফুটবল বোদ্ধাদের অনুমান!