চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের সেই জাদুকরী রাতে সোনালী ট্রফিতে লিওনেল মেসি যখন চুমু খেলেন, তখন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী ভেবে নিয়েছিলেন, ফুটবল মহাকাব্যের শেষ মধুরতম অধ্যায় বুঝি লেখা হয়ে গেছে। কিন্তু আলবিসেলেস্তেদের ‘নাম্বার টেন’ যেন এখনই থামতে রাজি নন!
উত্তর আমেরিকার মাটিতে আর্জেন্টিনার মিশন শুরু হতে আর মাত্র কয়েক ঘন্টা বাকি, তেখন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অধিনায়ক মেসি তৈরি হচ্ছেন পুরো মেগা টুর্নামেন্টকে নিজের রেকর্ড ভাঙার এক ব্যক্তিগত খেলার মাঠ বানিয়ে ফেলতে। আর্জেন্টিনা যদি নিজেদের চেনা ছন্দে থাকে এবং নকআউটের গভীরে যেতে পারে, তবে বিশ্বফুটবলের তাবড় তাবড় সব কিংবদন্তিদের অমর কীর্তি মেসির বুটের নিচে পিষে খড়কুটোর মতো উড়ে যাবে। যদিও মেসি নিজে বারবার দাবি করেন রেকর্ডের পেছনে তিনি ছোটেন না, তবুও পরিসংখ্যানের যে চোখধাঁধানো সমীকরণ তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে, তা দেখে যে কোনো ফুটবল ভক্তের চোখ কপালে উঠতে বাধ্য।
বুধবার সকালে জে-গ্রুপে আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে আর্জেন্টিনার উদ্বোধনী ম্যাচে মেসি শুধু মাঠে পা রাখলেই ইতিহাস সম্পূর্ণ নতুন করে লেখা হবে। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডটি (২৬টি ম্যাচ) ইতিমধ্যেই তাঁর একার দখলে। তবে বুধবারের ম্যাচে বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ফুটবল ইতিহাসের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে সর্বোচ্চ ছয়টি বিশ্বকাপ (২০০৬, ২০১০, ২০১৪, ২০১৮, ২০২২ এবং ২০২৬) খেলার একক ও অনন্য কীর্তি নিজের করে নেবেন এই জাদুকর।
তাঁর নামের পাশে বসার সুযোগ থাকছে শুধু ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং গিলের্মো ওচোয়ার। ২০০৬ সালে জার্মানির মাটিতে সার্বিয়া ও মন্টিনিগ্রোর বিপক্ষে ঝাঁকড়া চুলের এক তরুণের যে বিশ্বজয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ২০ বছর পর এসে সেই মেসিই এখন পুরো ফুটবল বিশ্বের ধরাছোঁয়ার বাইরে। ২০২২ সালের ফাইনালে জার্মানির লোথার ম্যাথিউসের ২৫ ম্যাচের রেকর্ড ভেঙেছিলেন তিনি, আর এবার ৪৮ দলের বর্ধিত এবং ১০৪ ম্যাচের এই দীর্ঘ টুর্নামেন্টে প্রতি মিনিটে তিনি নিজেকে নিয়ে যাবেন এমন এক উচ্চতায়, যা আগামী কয়েক প্রজন্মেও কেউ ভাঙতে পারবে না।
এবারের বিশ্বকাপে যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি বুক কাঁপিয়ে মেসির খেলা দেখবেন, তিনি হলেন জার্মানির কিংবদন্তি স্ট্রাইকার মিরোস্লাভ ক্লোসা। কারণ ক্লোসার গড়া দুটি ঐতিহাসিক রেকর্ড এবার মেসির পায়ের জাদুতে ধুলোয় মিশে যাওয়ার অপেক্ষায়!
প্রথমত, বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতার রেকর্ডটি ক্লোসার দখলে (১৭টি জয়)। মেসি বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছেন ১৬টি জয় নিয়ে। অর্থাৎ, গ্রুপ পর্বের প্রথম দুটি ম্যাচে আর্জেন্টিনা জিতলেই ক্লোসাকে টপকে বিশ্বমঞ্চের সবচেয়ে সফল ‘উইনার’ হয়ে যাবেন মেসি।
দ্বিতীয়ত, ফুটবলপ্রেমীদের সবচেয়ে আকর্ষণীয় রেকর্ড, বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা। ২০১৪ সালে ব্রাজিলের রোনালদোর রেকর্ড ভেঙে ১৬ গোল নিয়ে শীর্ষে বসেছিলেন ক্লোসা। অন্যদিকে বিশ্বকাপে মেসির গোল সংখ্যা এখন ১৩। আর তিন গোল করলে তিনি ক্লোসার পাশে বসবেন, আর ৪টি গোল করলে এককভাবে ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ গোলদাতা হয়ে যাবেন লিওনেল মেসি! গত কাতার বিশ্বকাপেই যিনি একাই ৭টি গোল করেছিলেন, তাঁর জন্য এই ৪টি গোল করা যে মোটেও অসম্ভব নয়, তা বলাই বাহুল্য।
মেসি শুধু গোল করতেই জানেন না, গোল করাতেও তিনি ওস্তাদ। ফিফার অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, যৌথভাবে সর্বকালের সবচেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট বা সতীর্থদের দিয়ে গোল করানোর রেকর্ডে শীর্ষে আছেন লিওনেল মেসি এবং আর্জেন্টিনার ফুটবল ঈশ্বর দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনা। দুই জাদুকরই বিশ্বমঞ্চে সতীর্থদের দিয়ে ৮টি করে গোল করিয়েছেন।
২০২৬ সালের বিশ্বকাপে আর মাত্র একটি নিখুঁত পাস বা অ্যাসিস্ট করতে পারলেই ‘এল দিওস’ ম্যারাডোনাকে পেছনে ফেলে এককভাবে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ‘অ্যাসিস্ট কিং’ হয়ে যাবেন মেসি।
অবশ্য বয়স এবং ৪৮ দলের এই মেগা আসরে দীর্ঘ ফরম্যাটের কারণে মেসির শারীরিক কন্ডিশন ও ফিটনেসই হবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। মেসি নিজে এখনো পুরোপুরি নিশ্চিত করে কিছু না বললেও, ফুটবল পণ্ডিতদের মতে, মেসি যদি মাঠে নামেন তবে তিনি শুধু একজন খেলোয়াড় হিসেবে খেলবেন না; বরং বিশ্বফুটবলের সব কটি প্রধান সিংহাসন নিজের নামে লিখে নিতেই বুট জোড়া পায়ে গলাবেন।
রেকর্ডের এই অবিশ্বাস্য ইঁদুর-বিড়াল দৌড়ে মেসি শেষ পর্যন্ত ক্লোসা ও ম্যারাডোনাকে ছাড়িয়ে ফুটবলের শেষ কিংবদন্তি হতে পারেন কি না, তা দেখার জন্য সোফাস্কোরের লাইভ ডাটার দিকে চোখ রেখে অধীর আগ্রহে প্রহর গুনছেন কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত!