বিশ্বকাপ ফুটবলের ডি-গ্রুপের প্রথম ম্যাচেই বড়সড় চড় খেয়েছে তুরস্ক এবং প্যারাগুয়ে। সবশেষ ইউরো আসরের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট তুরস্ককে অনেকেই এই বিশ্বকাপের ‘ডার্ক হর্স’ ভাবছিলেন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রথম ম্যাচেই ২-০ গোলে হেরে যাওয়ায় ভিনচেন্তো মন্তেল্লার দলের সেই বেলুন এক নিমেষেই ফুসকে গেছে। অন্যদিকে, সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ৪-১ গোলে বিধ্বস্ত হয়ে মাঠ ছেড়েছে ২০১০ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালিস্ট প্যারাগুয়ে।
বাংলাদেশ সময় শনিবার সকাল ৯টায় র এনএফএল’র সান ফ্রান্সিসকো ফোর্টি-নাইনআর্সের চেনা মাঠে যখন এই দুই আহত বাঘ মুখোমুখি হচ্ছে, তখন লক্ষ্য একটাই, যে কোনো মূল্যে টুর্নামেন্টে টিকে থাকা।
প্রথম ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার গোলবারে ২৮টি শট নিয়েও ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে কোনো গোল পায়নি ‘ক্রিসেন্ট স্টারস’ খ্যাত তুর্কিরা। ৬৩ শতাংশ বল পজিশন নিয়েও সেই ম্যাচে হারের পর ভাগ্য বদলাতে মরিয়া তারা। তবে প্যারাগুয়েকে হালকাভাবে নিলে ভুল করবে তুরস্ক।
কারণ ল্যাটিন আমেরিকার কঠিন বাছাইপর্বে এই প্যারাগুয়েই কিন্তু আর্জেন্টিনা এবং ব্রাজিলের মতো পরাশক্তিদের হারিয়ে বিশ্বমঞ্চের টিকিট কেটেছে। প্রথম ম্যাচের ভরাডুবির পর প্যারাগুয়ের তরুণ তারকা হুলিও এন্সিসো প্রতিপক্ষকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এখন আরও কঠোর পরিশ্রম করার সময়। আমরা প্যারাগুয়ানরা বারবার আছাড় খেয়েও উঠে দাঁড়াতে জানি, কখনো হার মানি না। দেশের মানুষকে আনন্দ দিতে আজ আমরা জানপ্রাণ লড়িয়ে দেব।
ম্যাচে তুরস্কের বড় দুশ্চিন্তা জুভেন্টাস তারকা কেনান ইলদিজের ফিটনেস, যিনি চোটের কারণে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নামতেই পারেননি। অন্যদিকে প্যারাগুয়ে শিবিরেও চোটের হানা লেগেছে; পেশির চোটের কারণে গুস্তাভো কাবায়েরো এবং গোড়ালির চোটে র্যামন সোসা আজকের ম্যাচ থেকে ছিটকে গেছেন। তবে, তুরস্কের কোচ ভিনচেন্তো মন্তেল্লার জন্য এটি এক ঐতিহাসিক ম্যাচ। কিংবদন্তি সেনোল গুনেসের (যিনি ২০০২ বিশ্বকাপে তুরস্ককে তৃতীয় করেছিলেন) পর মন্তেল্লাই দ্বিতীয় কোচ যিনি ইউরো এবং বিশ্বকাপ, দুই বড় মঞ্চেই তুরস্ককে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
ইতিহাসের দ্বিতীয় সাক্ষাৎ: বিশ্বকাপ মঞ্চে এই দুই দলের এটিই প্রথম দেখা। এর আগে ১৯৯৫ সালের জুনে চিলির মাটিতে একটি প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল তারা, যা ০-০ গোলে ড্র হয়।
টানা হারের রেকর্ড নেই: বড় আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে নিজেদের শেষ ১৩ ম্যাচের ৯টিতেই হারলেও (৪ জয়), বিশ্বকাপের ইতিহাসে কখনো টানা দুই ম্যাচ হারেনি তুরস্ক।
স্পেনের সেই ৬-০ ট্র্যাজেডি: অস্ট্রেলিয়ার কাছে প্রথম ম্যাচের হারটি ছিল গত ৮টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তুরস্কের প্রথম পরাজয়। এর আগে সবশেষ তারা ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে স্পেনের কাছে ঘরের মাঠে ৬-০ গোলে বিধ্বস্ত হয়েছিল।
ইউরোপীয় জুজু: ইউরোপের দলগুলোর বিরুদ্ধে খেলা নিজেদের শেষ ১৪টি বিশ্বকাপ ম্যাচের মাত্র ২টিতে জিতেছে প্যারাগুয়ে (২০০২ সালে স্লোভেনিয়া এবং ২০১০ সালে স্লোভাকিয়ার বিপক্ষে)।
রক্ষণভাগের বিপর্যয়: আমেরিকার বিরুদ্ধে প্রথমার্ধেই ৩ গোল খেয়ে বসেছিল প্যারাগুয়ে, যা তাদের আগের ১৬টি বিশ্বকাপ ম্যাচের সম্মিলিত প্রথমার্ধের গোলের সমান! অথচ বাছাইপর্বের ১৮টি ম্যাচের একটিতেও ২টির বেশি গোল হজম করেনি ‘লস গুয়ারানিস’রা।
রোমেরিতোর ছায়া: ম্যাচে হুলিও এন্সিসো বা মাউরিসিও যদি গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেন, তবে ১৯৮৬ সালে কিংবদন্তি রোমেরিতোর পর প্যারাগুয়ের প্রথম ফুটবলার হিসেবে ক্যারিয়ারের প্রথম দুই বিশ্বকাপ ম্যাচেই অবদান রাখার কীর্তি গড়বেন।
পণ্ডিতদের মতে, আক্রমণভাগের শক্তিতে তুরস্ক কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, বিদায়ঘণ্টা বাজার ভয়ে দুই দলই আজ রক্ষণ সামলাতে জান লড়িয়ে দেবে। অনেকেই ম্যাচটি ১-১ গোলে ড্র হওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন। এখন দেখার বিষয়, মন্তেল্লার তুর্কি গেমাররা সান ফ্রান্সিসকোয় নকআউটের আশা বাঁচিয়ে রাখতে পারে, নাকি এন্সিসোর ল্যাটিন ফুটবলের জাদুতে কপাল পুড়বে তুরস্কের!