৭০ সেকেন্ডে মরক্কোর সাইবারির জাদুতে স্কটিশ স্বপ্নভঙ্গ!

ম্যাচের প্রথম কয়েকটা সেকেন্ড অন্তত স্কটল্যান্ডের জন্য ভালোই ছিল। কিক-অফের পরপরই মরক্কো বলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে স্কটিশ রাইট-ব্যাক নাথান প্যাটারসনের পায়ে তুলে দিয়েছিল। কিন্তু সেখান থেকে স্কটল্যান্ড গোলরক্ষক অ্যাঙ্গাস গানের একটি দূরপাল্লার ক্লিয়ারেন্স সরাসরি সাইডলাইনের বাইরে চলে যাওয়ার পর থেকেই মূলত স্কটিশদের স্বপ্নের সলিল সমাধি ঘটার শুরু।

ম্যাচের বয়স তখন মাত্র ৭০ সেকেন্ড! ঘড়ির কাঁটা এক মিনিট পেরিয়ে দ্বিতীয় মিনিটে পা দিতেই মরক্কো যে গোলটি করল, তাতেই ম্যাচ থেকে ছিটকে গেল স্কটল্যান্ড। পুরো প্রথমার্ধ জুড়ে ফক্সবরোর মাঠে চলল মরক্কান ফুটবলের একচ্ছত্র রাজত্ব আর গতিঝড়, যা প্রমাণ করে দিল কেন তারা শুধু টুর্নামেন্টের ‘ডার্ক হর্স’ নয়, বরং আস্ত বিশ্বকাপেরই অন্যতম হট-ফেবারিট।

Morocco bully Scotland 01
দ্বিতীয়ার্ধে স্কটল্যান্ড জানপ্রাণ লড়িয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও মরক্কোর ইস্পাতকঠিন ডিফেন্স ভাঙতে পারেনি। ফলে ১-০ গোলের এক নির্মম পরাজয় সঙ্গী করে মাঠ ছাড়তে হয়েছে টার্টান আর্মিদের।

এই হারের ফলে বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো পুরুষ ফুটবল ইতিহাসে গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হয়ে নক আউটে যাওয়ার যে স্বপ্ন স্কটল্যান্ড দেখছিল, তা আবারও চরম খাদের কিনারায় এসে দাঁড়িয়েছে। শেষ ১৬-র টিকিট প্রায় নিশ্চিত করতে হলে আগামী ২৪ জুন ফুটবল পরাশক্তি ব্রাজিলের বিরুদ্ধে অন্তত একটি পয়েন্ট পেতেই হবে স্টিভ ক্লার্কের শিষ্যদের। গ্যালারি কাঁপানো হাজার হাজার স্কটিশ সমর্থক পুরো ম্যাচ জুড়েই গলা ফাটিয়েছেন ঠিকই, কিন্তু মাঠের নির্মম বাস্তবতায় মরক্কো ছিল আলোর চেয়েও গতিময়। পুরো ম্যাচে স্কটল্যান্ডকে একটিমাত্র শটও অন-টার্গেটে নিতে দেয়নি আশরাফ হাকিমিরা।

Morocco bully Scotland 02
বাছাইপর্বে হাইতিকে ১-০ গোলে হারিয়ে স্কটল্যান্ড কিছুটা স্বস্তিতে থাকলেও, মরক্কোর এই বিষাক্ত আক্রমণভাগকে বোতলবন্দি করার কোনো পরিকল্পনাই কাজে আসেনি কোচের। রিয়াল মাদ্রিদের ব্রাহিম দিয়াজ এবং পিএসজি-র আশরাফ হাকিমির জুটিকে রুখতে স্কটিশ ডিফেন্সে অ্যান্ডি রবার্টসন এবং কিরান টিয়ার্নিকে একই সাথে লেফট-সাইডে নামিয়েছিলেন স্টিভ ক্লার্ক।

কিন্তু মরক্কো ঠিকই সেই দেওয়াল ভেদ করে প্রথম মিনিটেই মারণ কামড় বসায়। মাঝমাঠ থেকে ব্রাহিম দিয়াজের বাড়ানো এক জাদুকরী ও নিখুঁত লং-বল স্কটিশ ডিফেন্ডার গ্রান্ট হ্যানলিকে সম্পূর্ণ বোকা বানিয়ে খুঁজে নেয় ইসমাইল সাইবারিকে। সাইবারি চোখের পলকে বলটি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে স্কটিশ কিপার অ্যাঙ্গাস গানকে পরাস্ত করে জালে জড়ান। কেন বায়ার্ন মিউনিখ এই তারকার পেছনে ৫৫ মিলিয়ন ইউরো ঢালতে যাচ্ছে, এই এক রুথলেস বা নির্মম ফিনিশেই তা বুঝিয়ে দিলেন সাইবারি। গ্যালারিতে বসা এক কট্টর স্কটিশ সমর্থক ম্যাচ চলাকালীন টেক্সট মেসেজে লিখেছেন, এটি ফুটবল নয়, শুধুই একটি খুন!"

Morocco bully Scotland 03
প্রথমার্ধের প্রথম ৪০ মিনিট মরক্কো স্রেফ ছেলেখেলা করেছে স্কটল্যান্ডের সাথে। মাঝমাঠে মাত্র ১৮ বছর বয়সী বিস্ময় বালক আইয়ুব বুয়াদ্দি এমনভাবে পুরো ম্যাচের সুতো নাড়াচাড়া করছিলেন, যেন তিনি কোনো অভিজ্ঞ দাবাড়ু। দুই প্রান্তে খানোস এবং আয়নাউইরা গতি দিয়ে স্কটিশ রক্ষণকে তছনছ করে দিচ্ছিলেন। তারা সুযোগগুলো হেলায় না হারালে প্রথমার্ধেই ব্যবধান ৩-০ হতে পারত।

বিরতির পর স্কটল্যান্ড অনেক গোছানো ফুটবল খেলেছে। অধিনায়ক রবার্টসনের এক ক্রস থেকে জন ম্যাকগিনের দুর্দান্ত এক ভলি প্রথমার্ধের ঠিক শেষ মুহূর্তে অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। দ্বিতীয়ার্ধে মাঝমাঠের জেনারেল স্কট ম্যাকটমিনে অনেকটা জায়গা তৈরি করে মরক্কোর বক্সে চাপ বাড়ালেও কাঙ্ক্ষিত সমতাসূচক গোলটি অধরাই থেকে গেছে। ব্রাজিলের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেও মরক্কো প্রথমার্ধে যেমন অতিমানবীয় খেলেছিল, স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধেও ঠিক একই চিত্র দেখা গেল, প্রথম ৪৫ মিনিটে অপ্রতিরোধ্য, আর পরের ৪৫ মিনিটে কিছুটা মন্থর।

Morocco bully Scotland 04
ইতিহাসের পাতায় বোস্টনের পাবগুলোকে নিজেদের চাদরে রাঙিয়ে দেওয়া এবং গ্যালারিতে অবিশ্বাস্য আনন্দ নিয়ে আসা স্কটিশ সমর্থকদের জন্য এই ১-০ ব্যবধানের হারটি অন্তত গোল ডিফারেন্সের বিচারে খুব একটা খারাপ নয়। টুর্নামেন্টের সেরা তৃতীয় স্থান অধিকারী দল হিসেবে নকআউটে যেতে হলে গোল ব্যবধানই হবে শেষ কথা, যা এই মুহূর্তে স্কটল্যান্ডের জন্য একদম ‘শূন্য’।

ব্রাজিলের কাছে যদি তারা শেষ ম্যাচে এক গোলের ব্যবধানেও হারে, তবুও হয়তো তাদের নকআউটের আশা বেঁচে থাকবে। কিন্তু স্টিভ ক্লার্কের দল কখনোই ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে ফুটবল খেলে না। রাতে বোস্টনের রাস্তাগুলোকে স্কটিশ উৎসবে মাতোয়ারা করে দিয়ে শনিবারই তারা মায়ামির বিমান ধরবেন ব্রাজিলের মুখোমুখি হতে। তবে সেই উৎসবের আমেজেও মিশে থাকবে বিদায়ের আতঙ্ক!