ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবলে আই-গ্রুপের সমীকরণ মেলাতে ভোর ৬টায় নিউ জার্সির ইস্ট রাদারফোর্ডে মুখোমুখি হচ্ছে নরওয়ে ও সেনেগালের ‘লায়নস অব তেরাঙ্গা’। প্রথম ম্যাচে ইরাককে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টেবিলের শীর্ষে থাকা স্ক্যান্ডিনেভিয়ানদের সামনে আজ শেষ ৩২ নিশ্চিত করার বড় সুযোগ।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের কাছে ৩-১ গোলে হারলেও দুর্দান্ত ফুটবল খেলা সেনেগালের জন্য আজকের ম্যাচটি টুর্নামেন্টে টিকে থাকার বাঁচা-মরার লড়াই। ফরাসিরা অন্য ম্যাচে ইরাকের মুখোমুখি হওয়ায়, গ্রুপের দ্বিতীয় স্থানের টিকিট কার পকেটে যাবে, তা অনেকটাই ঠিক করে দেবে আজকের এই রোমাঞ্চকর লড়াই।
দীর্ঘ ২৬ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে ফিরেই ইরাকের বিরুদ্ধে নিজেদের শক্তির জানান দিয়েছে নরওয়ে। আর বরাবরের মতোই সেই ধ্বংসযজ্ঞের সেনাপতি ছিলেন আর্লিং হাল্যান্ড, যাঁর প্রথমার্ধের জোড়া গোল নরওয়ের জয়কে সহজ করে দেয়। সলবাকেনের এই দলটি বর্তমানে টুর্নামেন্টের অন্যতম বিপজ্জনক আক্রমণভাগের মালিক, যার প্রমাণ মেলে তাদের শেষ ৯টি প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে করা ৪১টি গোলেই! আর সেনেগালকে হারাতে পারলে অন্য ম্যাচের ফলাফলের দিকে না তাকিয়েই সরাসরি নকআউটে চলে যাবে হাল্যান্ডরা।
তবে সেনেগালকে হালকাভাবে নিলে নরওয়ের কপালে দুঃখ আছে। ফ্রান্সের কাছে হারলেও পুরো ম্যাচে ফরাসি ডিফেন্সকে নাচিয়ে ছেড়েছেন মানে- জ্যাকসনরা। সেই ম্যাচের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ছিল কিশোর ফরোয়ার্ড ইব্রাহিম এমবায়ের সেই ঐতিহাসিক গোল। এছাড়া অতীত ইতিহাসও সেনেগালের পক্ষে কথা বলছে; ২০০৬ সালের একমাত্র প্রীতি ম্যাচে নরওয়েকে ২-১ গোলে হারিয়েছিল আফ্রিকান পরাশক্তিরা।
দুই শিবিরের জন্যই স্বস্তির খবর হলো, বড় কোনো ইনজুরির ধাক্কা ছাড়াই তারা পূর্ণ শক্তি নিয়ে মাঠে নামছে। নরওয়ের ডেভিড মোলার ওল্ফ এবং জুলিয়ান রিয়ারসন প্রথম ম্যাচের চোট কাটিয়ে শুরু থেকেই খেলবেন বলে আশা করা হচ্ছে। দলের মূল ভরসা অবশ্য আর্লিং হাল্যান্ড, যিনি জাতীয় দলের হয়ে টানা ১১টি ম্যাচে গোল করার এক অবিশ্বাস্য রেকর্ড নিয়ে মাঠে নামবেন। তাঁর পেছনে বল জোগানোর দায়িত্বে থাকবেন অধিনায়ক মার্টিন ওডিগার্ড, স্যান্ডার বার্জ এবং ফ্রেডরিক আউর্সনেস।
ওদিকে সেনেগাল শিবিরের ওয়ান্ডার-কিড ইব্রাহিম এমবায়ে ফ্রান্সের বিপক্ষে গোল করে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ আফ্রিকান গোলদাতা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছেন। শুরুর একাদশে ঢোকার জন্য তিনি মরিয়া হলেও কোচ পাপে থিয়াও হয়তো তাঁর অভিজ্ঞ ত্রয়ী- ইসমাইলা সার, নিকোলাস জ্যাকসন এবং সাদিও মানের ওপরই ভরসা রাখবেন। মাঝমাঠের দখল ধরে রাখার দায়িত্বে থাকবেন ইদ্রিসা গেয়ি এবং পাপে গেয়ি, আর রক্ষণের অতন্দ্র প্রহরী হিসেবে থাকছেন অভিজ্ঞ কালিদু কুলিবালি।
মাঠের লড়াইয়ে নামার আগে দুই দলের পরিসংখ্যানের খতিয়ান বেশ জমজমাট। নরওয়ে তাদের শেষ ৯টি ম্যাচের আটটিতেই জিতেছে এবং সবশেষ চার ম্যাচে তারা অপরাজিত। আর্লিং হাল্যান্ড আন্তর্জাতিক ফুটবলে টানা ১১ ম্যাচে গোল করার এক অতিমানবীয় ফর্মে আছেন।
সেনেগাল তাদের শেষ ৩টি ম্যাচের একটিতেও জয়ের মুখ দেখেনি।ইতিহাস বলছে, সেনেগাল তাদের খেলা শেষ তিনটি বিশ্বকাপের মধ্যে দুটিতেই গ্রুপ পর্বের বৈতরণী পার হতে পেরেছিল, যেখানে নরওয়ে ১৯৯৮ সালের পর প্রথমবার নকআউটে ওঠার স্বপ্ন দেখছে।
দুই দলেই যেমন বিশ্বমানের আক্রমণভাগ রয়েছে, তেমনই সাম্প্রতিক সময়ে তাদের রক্ষণভাগের নড়বড়ে রূপটাও সামনে এসেছে। হাল্যান্ডের ফিনিশিং লাইনের সামনে কুলিবালিদের ডিফেন্স যেমন কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়বে, তেমনই মানে-জ্যাকসনদের গতি আর শারীরিক ফুটবল নরওয়ের রক্ষণভাগকে কাঁপিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। দুই দলের এই মরণপণ লড়াইয়ের তীব্রতা এতটাই বেশি যে, ফুটবল পণ্ডিতদের ধারণা, ম্যাচটি কোনো এক তরফা ফল নয়, বরং ২-২ গোলের এক হাই-স্কোরিং ড্র দিয়ে শেষ হতে পারে।