ফুটবলের সৌন্দর্য বুঝতে শুরু করেছে আমেরিকানরা

ফুটবল যে আমেরিকার মাটির কোনো প্রান্তিক খেলা নয়, বরং পুরো দুনিয়া শাসন করা এক নম্বর রাজত্ব, চলতি ২০২৬ বিশ্বকাপ যেন মার্কিন নাগরিকদের সেই হুশ ফিরিয়ে দিচ্ছে। আর, এই ফুটবল জোয়ারের সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি কোনো বিশ্বখ্যাত সুপারস্টারের পা থেকে আসেনি; এসেছে কেপ ভার্দের ৪০ বছর বয়সী বুড়ো গোলরক্ষক ভোজিনহার হাত ধরে! পরাশক্তি স্পেনের বিরুদ্ধে গোলশূন্য ড্রয়ের ম্যাচে অবিশ্বাস্য ৭টি সেভ করে রাতারাতি সোশ্যাল মিডিয়া সেনসেশন বনে গেছেন তিনি।

US World Cup 14
খেলাধুলা বিষয়ক জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ইভান হ্যান্ড অবাক হয়ে জানান, আমার জন্য সবচেয়ে বড় ধাক্কা ছিল ভোজিনহার ঘটনাটি। ম্যাপে যে কেপ ভার্দে দেশটা কোথায় তা অধিকাংশ আমেরিকান বলতে পারবে না, সেই দেশের একজন গোলরক্ষক শুধু এক রাতে ১৫ মিলিয়ন (১ কোটি ৫০ লাখ) ফলোয়ার পেয়ে গেলেন! আমেরিকার এনএফএল ইতিহাসের সবচেয়ে সফল মহাতারকা টম ব্র্যাডিরও এর চেয়ে কম ফলোয়ার আছে। আমেরিকানরা আসলে এতদিনে ফুটবলের আসল ব্যাপ্তি ও ক্ষমতা টের পাচ্ছে।

US World Cup 13
রয়টার্সের এক পরিসংখ্যান ও ফিফার ডাটা অনুযায়ী, এবারের বিশ্বকাপের প্রথম ৪৪টি ম্যাচেই রেকর্ড ২.৮৫ মিলিয়নেরও বেশি দর্শক স্টেডিয়ামে খেলা দেখেছেন, যেখানে গ্যালারির আসন পূর্ণতার গড় হার প্রায় ৯৯.৬ শতাংশ! শুধু তা-ই নয়, অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে আমেরিকার জয়ের ম্যাচটি ফক্স টেলিভিশনে ১৬.২ মিলিয়ন মানুষ উপভোগ করেছেন, যা মার্কিন ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন রেকর্ড।

US World Cup 15
স্পোর্টস মার্কেটিং অ্যানালিস্ট বব ডর্ফম্যানের মতে, আমেরিকানরা এবার কেবল এলিট ফুটবলারদেরই দেখছে না, বরং গ্যালারিতে ব্রাজিল কিংবা স্কটল্যান্ডের সমর্থকদের যে পাগলাটে উন্মাদনা, তা দেখে তারা রীতিমতো ঈর্ষা প্রকাশ করছে। তিনি বলেন, ব্রাজিলের ম্যাচ চলার সময় যখন গ্যালারির সবাই একসাথে জাতীয় সঙ্গীত গাইছিল, তা দেখে আমার গলার কাছে কান্না দলা পাকিয়ে আসছিল। এই আবেগ, এই উত্তেজনা সত্যিই অবিশ্বাস্য। ব্রাজিল বা সাইবেরিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটা ছেলেও ফুটবলের জন্য জীবন দিতে পারে, এই অন্ধ ভালোবাসা আমেরিকানদের চোখ খুলে দিয়েছে।

US World Cup 07
আমেরিকা বনাম তুরস্ক ম্যাচের আগে লস অ্যাঞ্জেলেস স্টেডিয়ামের বাইরে তৈরি হয়েছিল এক অভাবনীয় কার্নিভাল। সমর্থকরা ড্রাম বাজিয়ে, লাল-সাদা-নীল ধোঁয়ার বোম ফাটিয়ে একাকার করে ফেলেছিল। গ্যালারিতে খেলা দেখতে আসা অ্যালিসিয়া রুটজ নামের এক সাবেক ফুটবলার (যিনি নিজে ‘ওয়ান্ডার ওম্যান’ সেজে এসেছিলেন এবং তাঁর স্বামী এসেছিলেন বিখ্যাত কাল্পনিক কোচ ‘টেড ল্যাসো’র বেশে) উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন, আমেরিকানরা এখন ফুটবলের ছোট ছোট সৌন্দর্য বুঝতে পারছে। তারা শুধু গোলের জন্যই চিৎকার করছে না, বরং নিখুঁত পাস, ড্রিবলিং বা স্কিলের জন্যও হাততালি দিচ্ছে। দেশের যুব ফুটবল যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে একদিন ফুটবল আমেরিকার প্রধান খেলা এনএফএল-এর সমকক্ষ হবে।

US World Cup 05
লিওনেল মেসি, ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো আর ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিকের ছোঁয়ায় আমেরিকার তরুণ প্রজন্ম এখন ফুটবলে বুঁদ। তবে আগস্ট মাস এলেই যখন আমেরিকার আসল ‘ধর্ম’ অর্থাৎ আমেরিকান ফুটবল বা এনএফএল’র প্রি-সিজন, ‘হার্ড নকস’ আর কলেজ ফুটবল শুরু হবে, তখন এই ফুটবল জোয়ার কতটুকু টিকবে, তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা।

US World Cup 06
ইভান হ্যান্ডের মতে, এখন হয়তো হাজারো ছোট্ট টিমি বা এমিলি ক্রিশ্চিয়ান পুলিসিক হতে চাচ্ছে। কিন্তু তার চেয়েও বড় সংখ্যায় শিশুরা এখনো প্যাট্রিক মাহোমসের মতো এনএফএল তারকাদেরই আইডল মানে। আগস্ট এলেই মানুষ হয়তো ভুলে যাবে যে ফুটবল বিশ্বকাপ বলে কিছু ঘটেছিল। ডর্ফম্যানও মনে করেন, আমেরিকার বাজারে এনএফএল-ই আসল রাজা, সুপার বোলই তাদের আসল উৎসব।

US World Cup 04
তবে আগস্টে যা-ই ঘটুক না কেন, ২০২৬ সালের এই বিশ্বকাপ আমেরিকার মাটিতে ফুটবল প্রচারকদের সেই উদ্দেশ্য সফল করেছে, যা তারা ১৯৯৪ বিশ্বকাপ থেকে চেষ্টা করে আসছিল, ফুটবলের এই মহাজাগতিক বিশালতাকে মার্কিনীদের পক্ষে আর উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। আমেরিকা ফুটবলকে আপন করে নিক বা না নিক, ফুটবল তার নিজের রাজকীয় মহিমায় যে বিশ্বসেরা, তা ওয়াশিংটনকে ভালোভাবেই বুঝিয়ে দিল এই টুর্নামেন্ট!