গুরুকে মেরেই শেষ যোলতে যেতে মরিয়া শিষ্যরা

হিউস্টনের মাঠে রাত ১১টায় যখন ফুটবল বিশ্বকাপের প্রথম নকআউট ম্যাচে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল ও জাপান, তখন তা কেবল দুই দেশের মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ থাকছে না। এটি মূলত ফুটবল দুনিয়ার এক রোমাঞ্চকর গুরু-শিষ্যের লড়াই! কারণ, এশিয়ার চারবারের চ্যাম্পিয়ন জাপানের আজকের এই আধুনিক ফুটবলের রূপকার ও শিক্ষক কিন্তু স্বয়ং পাঁচবারের বিশ্বসেরা ব্রাজিল। নিজের গুরুকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে যাওয়ার স্বপ্নপূরণের লক্ষ্যে আজ ছক কষছেন জাপানি বস হাজিমে মোরিয়াসু।

জাপানের ঘরোয়া ফুটবল লিগ ‘জে-লিগ’ যখন ১৯৯৩ সালে পথচলা শুরু করে, তখন তারা শুধু ব্রাজিলের ফুটবল শৈলী থেকেই অনুপ্রেরণা নেয়নি, বরং দলে দলে ব্রাজিলিয়ান তারকাদের উড়িয়ে এনেছিল নিজেদের ফুটবলকে সমৃদ্ধ করতে। ১৯৮২ সালের ব্রাজিলের জাদুকরী মিডফিল্ডার জিকো অবসর ভেঙে যোগ দিয়েছিলেন জাপানের কাশিমা অ্যান্টলার্সে।

Zico 01
এরপর বিসমার্ক, এলিভেলটনের মতো তারকারা জাপানে সাম্বার জোয়ার আনেন। ১৯৯০-এর দশকের শেষের দিকে, ১৯৯৪ বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল দলের অধিনায়ক দুঙ্গাসহ মোট ৭ জন বিশ্বচ্যাম্পিয়ন তারকা জাপানি ক্লাবগুলোর হয়ে মাঠ কাঁপিয়েছেন এবং জাপানের তরুণ ফুটবলারদের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছেন ফুটবলের আসল ব্যাকরণ।

এমনকি ১৯৯৮ বিশ্বকাপে খেলা ব্রাজিলের সেসার সাম্পাইও সেসময় জাপানের ক্লাব ইয়োকোহামার হয়ে খেলতেন। জাপানের এই অবিশ্বাস্য উন্নতি দেখে সাম্পাইও বলেন, যারা জাপানি ফুটবলকে নিয়মিত দেখে না, তারা আজ অবাক হতে পারে, কিন্তু আমি নই। বছরের পর বছর, ধাপে ধাপে ওরা উন্নতি করেছে। ওদের ডিসিপ্লিন বা শৃঙ্খলা সবসময়ই অসাধারণ ছিল। আর এখন ওদের দলে দাইজেন মায়েদা কিংবা আয়াসে উয়েদার মতো বিশ্বমানের ফুটবলার আছে। ব্রাজিলের মুখোমুখি হওয়াটা হবে ওদের জন্য চূড়ান্ত পরীক্ষা।

Japan Team 01
বিশ্বকাপের মঞ্চে জাপান কখনো ব্রাজিলকে হারাতে না পারলেও অলিম্পিক ও প্রীতি ম্যাচে তাদের অঘটন ঘটানোর ইতিহাস আছে। ১৯৯৬ সালের অলিম্পিকে ব্রাজিলকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফুটবল দুনিয়াকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল জাপান, যা ইতিহাসে ‘মিরাকল ইন মিয়ামি’ নামে পরিচিত। আর মাত্র গত বছরের অক্টোবরে টোকিওতে এক প্রীতি ম্যাচে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকে ৩-২ ব্যবধানে হারিয়েছে এই মোরিয়াসুর দলই।

বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই দল এর আগে মাত্র একবারই মুখোমুখি হয়েছিল ২০০৬ সালের জার্মানি বিশ্বকাপে। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, সেদিন জাপানের ডাগআউটে কোচ হিসেবে বসেছিলেন স্বয়ং জিকো—যিনি জাপানি ফুটবলের সবচেয়ে বড় কারিগর! কিন্তু গুরুর সেই আবেগের দিনে ডর্টমুন্ডের মাঠে জাপানকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দিয়েছিল ব্রাজিল।

সেই জাপান দলে খেলেছিলেন আলেসান্দ্রো সান্তোস, যিনি মূলত ব্রাজিলে জন্মগ্রহণ করলেও পরে জাপানের নাগরিকত্ব নিয়ে বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। জাপানের হয়ে খেলা এমন তিন ব্রাজিলিয়ান বংশোদ্ভূত ফুটবলারের একজন হলেন মার্কাস তুলিও তানাকা, যিনি ২০১০ বিশ্বকাপে জাপানের রক্ষণভাগ সামলেছেন।

Netherlands v Japan 04
এই ঐতিহাসিক ম্যাচ নিয়ে রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তুলিও তানাকা এক আবেগঘন ও ঝাঁঝালো মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেন, জাপান ও ব্রাজিলের এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক গভীর। আমি যখন প্রথম ছাত্র হিসেবে জাপানে এসেছিলাম, তখন ভাবতাম, কবে এমন একটা দিন আসবে যখন এই দুই দল বিশ্বকাপে সমানে সমানে লড়াই করবে? সেই দিনটি আমাদের কল্পনার চেয়েও অনেক দ্রুত চলে এসেছে। এই বিশ্বকাপে দুই দলের ব্যবধান, এমনকি খেলোয়াড়দের কন্ডিশনিংয়ের পার্থক্য আগের চেয়ে অনেক কমে এসেছে। জাপান দলের জন্য বিশ্বকাপের মঞ্চে ব্রাজিলকে বধ করার এটাই জীবন-মরণ এবং একমাত্র সেরা সুযোগ!

গুরুকে হারিয়ে শিষ্যরা আজ ইতিহাস গড়বে, নাকি ওস্তাদের মার শেষ রাতে দেখিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে যাবে ব্রাজিল, হিউস্টনের হাইভোল্টেজ ম্যাচ শুরুর আগেই সেই উত্তেজনার পারদ এখন তুঙ্গে!