১০ তারকার শেষ বিশ্বকাপ মিশন: কার রেকর্ড কেমন?

চলতি বিশ্বকাপের নকআউট পর্বের মহাগুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো শুরু হয়ে গেছে। মাঠের লড়াই যখন জমজমাট, তখন বিশ্বফুটবলের কোটি কোটি ভক্তদের মনে এক বিষাদের সুরও বাজছে। কারণ, এটিই হতে যাচ্ছে বর্তমান ফুটবল বিশ্বের এক সোনালী প্রজন্মের অন্তত ১০ জন মহাতারকার শেষ বিশ্বকাপ মিশন।

বয়স আর ক্যারিয়ারের সায়াহ্নে দাঁড়িয়ে ট্রফি ছোঁয়ার কিংবা শেষবার নিজেকে উজার করে দেওয়ার এই মঞ্চে রেকর্ড ও পরিসংখ্যানের পাতায় কার অবস্থান কেমন, তা নিয়ে একটি বিশেষ র‌্যাংকিং তুলে ধরা হলো:

১. লিওনেল মেসি (আর্জেন্টিনা) | সেরা সাফল্য: চ্যাম্পিয়ন (২০২২)

৩৫ বছর বয়সে কাতারে অধরা বিশ্বকাপ ট্রফি জয়ের পরও আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বুট তুলে রাখেননি আলবিসেলেস্তে অধিনায়ক। বর্তমানে ৩৯ বছর বয়সী মেসি নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে খেলছেন, যা ফুটবল ইতিহাসে এক অনন্য কীর্তি। এখন পর্যন্ত বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৯টি গোল ও আটটি অ্যাসিস্টের মালিক তিনি। ২০১৪ সালে রানার্স-আপ হয়ে গোল্ডেন বল জেতা মেসি ২০২২ সালেও টুর্নামেন্ট সেরা হন। ২০৩০ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে এই খুদে জাদুকরকে আর দেখা যাবে না—এটিই স্বাভাবিক বাস্তবতা।

২. লুকা মদ্রিচ (ক্রোয়েশিয়া) | সেরা সাফল্য: রানার্স-আপ (২০১৮)

চলতি আসরেও ৪০ বছর ২৯১ দিন বয়সে অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক অ্যাসিস্টদাতার রেকর্ড গড়েছেন লুকা মদ্রিচ। ২০১৮ সালে ক্রোয়েশিয়াকে ফাইনালে তোলা এবং ২০২২ সালে তৃতীয় স্থান এনে দেওয়া এই মিডফিল্ডারকে নিয়ে সতীর্থ পেতার সুচিচ বলেন, সে এমনভাবে খেলে যেন তার বয়স ২০ বছর। পাঁচটি বিশ্বকাপে দেশের হয়ে ২০০-র বেশি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা মদ্রিচ এবারই শেষবারের মতো বিশ্বমঞ্চ মাতিয়ে যাচ্ছেন।

৩. ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো (পর্তুগাল) | সেরা সাফল্য: সেমি-ফাইনাল (২০০৬)

পর্তুগিজ মহাতারকা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বর্ণিল ক্যারিয়ারে একমাত্র অধরা ট্রফি এই বিশ্বকাপ। ৪১ বছর বয়সী এই স্ট্রাইকার আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বাধিক ম্যাচ (২৩১) ও গোলের (১৪৫) মালিক। এটি সিআরসেভেনেরও ষষ্ঠ বিশ্বকাপ। ছয়টি ভিন্ন বিশ্বকাপে গোল করা একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ২৫ ম্যাচে ১০ গোলের কীর্তি রয়েছে তার। পর্তুগালের হয়ে শেষ সুযোগে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার লক্ষ্যে গত সপ্তাহেই জোড়া গোল করে তিনি হুঙ্কার দিয়েছেন, ‘আই অ্যাম ব্যাক!’

৪. ম্যানুয়েল নয়ার (জার্মানি) | সেরা অর্জন: চ্যাম্পিয়ন (২০১৪)

সাম্প্রতিক সময়ে ফর্মের ওঠানামা থাকলেও ৪০ বছর বয়সী বায়ার্ন মিউনিখের এই গোলরক্ষক সর্বকালের অন্যতম সেরা সুইপার-কিপার। ২০১৪ সালে জার্মানির বিশ্বকাপ জয়ে গোল্ডেন গ্লাভস জেতা নয়ারের এটি পঞ্চম বিশ্বকাপ। দেশের হয়ে বিশ্বকাপে ২৩টি ম্যাচ খেলা এই অভিজ্ঞ তারকা এবার জার্মানির শেষ ৩২ থেকে বিদায়ের তিক্ত স্বাদ পেলেও, ফুটবল ইতিহাসে তার ঐতিহ্য চিরকাল অম্লান থাকবে।

৫. নেইমার (ব্রাজিল) | সেরা সাফল্য: সেমি-ফাইনাল (২০০৪)

২০১৪ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপে ব্রাজিলের স্বপ্নের সারথি ছিলেন তৎকালীন ২২ বছরের নেইমার। তবে কোয়ার্টার ফাইনালে পিঠের ইনজুরিতে তার সেই যাত্রা থমকে যায়। বর্তমানে ৩৪ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড ২০২২ সাল থেকে চোটের সাথে লড়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে সেলেসাওদের জার্সিতে ফেরার পর নেইমারের চোখের জলই বলে দেয় দেশের জন্য এই ট্রফিটা কতটা আকুলতা তৈরি করে। বিশ্বকাপে ১৪ ম্যাচে আট গোল ও চার অ্যাসিস্ট করা নেইমারের সামনে শৈশবের স্বপ্ন ছোঁয়ার এটাই শেষ সুযোগ।

৬. কেভিন ডি ব্রুইন (বেলজিয়াম) | সেরা সাফল্য: সেমি-ফাইনাল (২০১৮)

বেলজিয়ামের ‘সোনালী প্রজন্ম’ হিসেবে পরিচিত দলটির মূল চালিকাশক্তি ছিলেন কেভিন ডি ব্রুইন। ২০১৮ সালে সেমি-ফাইনাল এবং ২০২২ সালে গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায়ের পর, এবার রুডি গার্সিয়ার দল শেষ ৩২-এ মিশরের মুখোমুখি হওয়ার অপেক্ষায়। ক্যারিয়ারের শেষলগ্নে এসে নিজের চেনা ছন্দে বেলজিয়ামকে বহুদূর নিয়ে যাওয়াই এখন এই মিডফিল্ড মাস্টারের প্রধান লক্ষ্য।

৭. ভার্জিল ফন ডাইক, নেদারল্যান্ডস - সেরা সাফল্য: কোয়ার্টার-ফাইনাল (২০২২)

এটা শুনে অবাক লাগতে পারে যে ফন ডাইক বিশ্বকাপে তার দেশের হয়ে মাত্র আটবার খেলেছেন, কিন্তু নেদারল্যান্ডস ২০১৮ সালের টুর্নামেন্টের জন্য যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি - যে বছর তিনি লিভারপুলে চলে যান।

২০২২ সালে ডাচরা বেশ ভালো খেলেছিলো, যেখানে কোয়ার্টার-ফাইনালে তারা শেষ পর্যন্ত বিজয়ী আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতে হেরে বাদ পড়েছিলো। আর এই বছর মাত্র তিনটি ম্যাচের মধ্যেই তারা কাতারে পাঁচ ম্যাচে করা গোলের সমান গোল করে ফেলেছিল - যদিও তারা ২০২২ সালের সমান সংখ্যক গোল হজমও করেছিলো।

নেদারল্যান্ডসের অধিনায়ক ফন ডাইক একটি গোল দিয়ে তার টুর্নামেন্ট শুরু করলেও শেষ ৩২-এ মরক্কোর কাছে পেনাল্টি শুটআউটে হেরে টুর্নামেন্টের সমাপ্তি ঘটে।

৩৪ বছর বয়সে এটাই কি ফন ডাইকের শেষ বিশ্বকাপ উপস্থিতি হবে?

৮. মোহাম্মদ সালাহ, মিশর - সেরা ফলাফল: শেষ ৩২* (২০২৬)

যখন মিশর নিউজিল্যান্ডকে হারিয়ে শেষ ৩২-এ তাদের জায়গা প্রায় নিশ্চিত করে, তখন এটি ছিলো ১৯৩৪ সালের পর তাদের প্রথম বিশ্বকাপে জয় এবং দ্বিতীয়ার্ধে একটি গোল ও একটি অ্যাসিস্ট করে সালাহ এই জয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

৩৪ বছর বয়সী এই খেলোয়াড়ের জন্য এটি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বার অংশগ্রহণ। এর আগে মিশর ২০১৮ সালে ৩৮ বছরের খরা কাটিয়ে বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করলেও ২০২২ সালে বাদ পড়েছিলো।

রাশিয়ায় পুরোপুরি ফিট না থাকা সালাহ দুটি গোল করলেও তার দেশ গ্রুপ পর্বের তিনটি ম্যাচেই হেরে যায়। বিশ্বকাপে পাঁচ ম্যাচে তার মোট গোল ও অ্যাসিস্টের সংখ্যা তিনটি।

শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়ার জন্য শুক্রবার সালাহর মিশর অস্ট্রেলিয়ার মুখোমুখি হবে। 

৯. সন হিউং-মিন, দক্ষিণ কোরিয়া - সেরা সাফল্য: শেষ ষোলো (২০২২)

বিশ্বকাপে সনের (তিনটি) চেয়ে বেশি গোল বা ৩৩ বছর বয়সী এই খেলোয়াড়ের চেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ (১৩টি) কোনো দক্ষিণ কোরিয়ান খেলোয়াড় খেলেননি। কিন্তু তার দেশের জন্য এই বিশ্বকাপ ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গেছে।

স্পার্সের সাবেক এই খেলোয়াড় হয়তো চার বছর পর আরেকটি সুযোগ পেতে পারেন, কিন্তু তিনি আর আগের মতো শক্তিশালী নন, যা তার গ্রুপ পর্বের পারফরম্যান্সেই স্পষ্ট, যেখানে তিনি কোনো গোল বা অ্যাসিস্ট করতে পারেননি। গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে সনকে প্রথম একাদশ থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল।

দক্ষিণ কোরিয়ার এই অধিনায়ক চারটি বিশ্বকাপে খেলেছেন এবং তার সেরা মুহূর্ত হলো ২০১৮ সাল, যেখানে তিনি মেক্সিকো ও জার্মানির বিপক্ষে গোল করেছিলেন। কিন্তু তিনি এবং তার স্বদেশীরা নিজেদের মাটিতে সেমিফাইনালে পৌঁছানো ২০০২ সালের দলের গড়া মানের ধারেকাছেও পৌঁছাতে পারেননি।

১০. সাদিও মানে, সেনেগাল - সেরা সাফল্য: শেষ ষোলো (২০২২)

২০১৮ সালের আগে বিশ্বকাপে সেনেগালের একমাত্র অংশগ্রহণ ছিল ২০০২ সালে। মানের হাত ধরে তারা বিগত তিনটি বিশ্বকাপের জন্য যোগ্যতা অর্জন করেছে।

এই ৩৪ বছর বয়সী খেলোয়াড় ২০১৮ সালে বিশ্বকাপে তার একমাত্র গোলটি করেন, কিন্তু হাঁটুর চোটের কারণে তিনি ২০২২ সালের টুর্নামেন্ট থেকে ছিটকে যান, যখন সেনেগাল শেষ ষোলো থেকে বাদ পড়েছিল।

এর আগে কাতারে অনুষ্ঠিত টুর্নামেন্টের জন্য তার দেশকে যোগ্যতা অর্জনে সাহায্য করতে তিনি একটি প্লে-অফ ম্যাচে মিশরের বিপক্ষে জয়সূচক পেনাল্টি গোল করেছিলেন।

সালাহর মতোই, লিভারপুলের এই প্রাক্তন খেলোয়াড়কে ২০৩০ সালের টুর্নামেন্টে দেখাটা বেশ কষ্টকল্পিত হবে। শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেওয়ার জন্য সেনেগাল বুধবার বেলজিয়ামের মুখোমুখি হবে।