বজ্রপাত ও ঝড়ের কারণে ম্যাচ শুরু হতে দেরি হয়েছিল এক ঘণ্টা। কিন্তু ঘরের মাঠ এস্তাদিও আজতেকার গ্যালারিতে যখন ১৪৯ ডেসিবেল মাত্রার অবিশ্বাস্য গর্জন উঠলো, তখন মাঠের সব ঝড় যেন এক নিমেষেই রূপ নিলো মেক্সিকান উল্লাসে। ইকুয়েডরকে ২-০ গোলে উড়িয়ে দিয়ে বিশ্বকাপের শেষ ৩২-এর ম্যাচে মহাকাব্যিক জয় তুলে নিয়েছে ‘এল ট্রি’রা। আর এই জাদুকরী জয়ের মাধ্যমেই ১৯৮৬ সালের পর—অর্থাৎ দীর্ঘ ৩৬ বছর পর—বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে কোনো ম্যাচ জেতার ঐতিহাসিক খরা কাটালো মেক্সিকো।
ম্যাচের প্রথমার্ধে হাভিয়ের আগুইরের শিষ্যদের গতিময় ও আক্রমণাত্মক ফুটবলের সামনে স্রেফ খড়কুটোর মতো উড়ে গেছে ইকুয়েডর। হুলিয়ান কিনিয়োনেস ও অভিজ্ঞ রাউল হিমেনেজের প্রথমার্ধের দুই গোলেই মেক্সিকোর শেষ ষোলোর টিকেট নিশ্চিত হয়ে যায়। নকআউট পর্বের পরবর্তী ম্যাচে আগামী রোববার মাঠে নামবে তারা, যেখানে তাদের সম্ভাব্য প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ড অথবা ডিআর কঙ্গো।
ম্যাচের আগে অবশ্য মাঠের বাইরে কম নাটক হয়নি। আগের রাতে ইকুয়েডরের হোটেলের সামনে কয়েকশ মেক্সিকান সমর্থক জড়ো হয়ে হট্টগোল করায় তাদের ঘুমে ব্যাঘাত ঘটে, যা নিয়ে ফিফার কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও করেছে ইকুয়েডর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন। এরপর স্টেডিয়ামে আসার পথে যানজট এবং বৈরী আবহাওয়ার কারণে দলটির প্রস্তুতি এমনিতেই এলোমেলো হয়ে গিয়েছিলো। তবে সব ঝড়-বৃষ্টি ছাপিয়ে খেলা শুরু হতেই মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেয় মেক্সিকো।
যদিও প্রথম ১৫ মিনিটে জন ইয়েবোয়ার একটি শট পোস্টে লেগে ফিরে আসলে কিছুটা ভড়কে গিয়েছিল স্বাগতিকেরা, তবে ম্যাচের ২১ মিনিটে ডেডলক ভাঙেন কিনিয়োনেস। বাঁ দিক থেকে জেসুস গ্যালার্দোর রক্ষণচেরা পাস ধরে বক্সে ঢুকে ডান পায়ের জোরালো শটে ইকুয়েডরের গোলরক্ষক হার্নান গালিন্দেসকে পরাস্ত করেন তিনি। জালের উপরের অংশে বল জড়ানোর সঙ্গে সঙ্গেই আজতেকা স্টেডিয়ামে উল্লাসের সুনামি বয়ে যায়।
মেক্সিকোর এই আক্রমণাত্মক ছন্দের নেপথ্য কারিগর ছিলেন তাদের ১৭ বছর বয়সী বিস্ময়বালক গিলবার্তো মোরা। চাপের মুখেও ডান প্রান্তে রবার্তো আলভারাদোর সঙ্গে মিলে ইকুয়েডরের ডিফেন্সকে নাচিয়ে ছাড়েন এই তরুণ তুর্কি।
ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি আসে মোরার প্রায় দ্বিগুণ বয়সী অভিজ্ঞ স্ট্রাইকার রাউল হিমেনেজের পা থেকে। ম্যাচের ৩৫ মিনিটে ইকুয়েডর ডিফেন্ডার জোয়েল অর্দোনেজের একটি ভুল ক্লিয়ারেন্সের সুযোগ নেন ৩৫ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড। কিনিয়োনেসের সঙ্গে দ্রুত পাস আদান-প্রদান করে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে ব্যবধান ২-০ করেন হিমেনেজ।
দ্বিতীয়ার্ধে ইকুয়েডরের কোচ সেবাস্তিয়ান বেকাসেসে দুটি পরিবর্তন এনে বলের দখল বাড়ানোর চেষ্টা করলেও মেক্সিকোর জমাট রক্ষণে ফাটল ধরাতে পারেননি। উল্টো মেক্সিকান অধিনায়ক সেসার মন্তেস দুটি দুর্দান্ত হেডারে ব্যবধান আরও বাড়ানোর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়েছিলেন। ম্যাচের শেষ দিকে ইকুয়েডরের পিয়েরো হিনকাপিয়ে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়লে দলটির ঘুরে দাঁড়ানোর সব আশা শেষ হয়ে যায়।
ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে মাঠ ছাড়ার সময় মেক্সিকোর নতুন তারকা গিলবার্তো মোরাকে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানায় পুরো স্টেডিয়াম। মেক্সিকো সিটির কেন্দ্রস্থল পাসেও দে লা রেফোর্মা বরাবর বসানো ৩৯টি বিশাল পর্দায় খেলা দেখতে জড়ো হওয়া লাখো সমর্থকের রাতভর উদযাপনে এখন কাঁপছে পুরো মেক্সিকো।
