আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগের অনমনীয় ‘দেয়াল’ ক্রিস্টিয়ান ‘কুটি’ রোমেরো আজ যে বিশ্বমঞ্চে বুক চিতিয়ে লড়াই করছেন, তার পেছনে রয়েছে এক অলৌকিক বিশ্বাসের গল্প এবং এক মায়ের অবিচল প্রার্থনা। শৈশবে তিন মাস থেকে সাত বছর বয়স পর্যন্ত তীব্র শ্বাসকষ্ট ও ব্রঙ্কোস্পাজমের সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে ছোট্ট কুটিকে। সেই কঠিন দিনগুলোতে ক্লিনিকের ঠাণ্ডা ঘরে ছেলেকে আগলে রেখেছিলেন মা রোসা।
ঈশ্বরের ওপর অগাধ বিশ্বাস থেকে রোসা এক অবিশ্বাস্য সিদ্ধান্ত নেন, ছেলের সুস্থতা কামনায় তিনি কুটির জন্মের সময় কেটে রাখা নাড়ি নিয়ে চলে যান কর্ডোবার পারাচাস্কা উপত্যকার বিখ্যাত ‘স্যাঙ্কচুয়ারি অব আল্টা গ্রাসিয়া’ গির্জায়। ফ্রান্সের লর্ডস গুহার আদলে তৈরি সেই পবিত্র গির্জায় আজও যত্নে রাখা আছে রোমেরোর শৈশবের সেই স্মারক।
মায়ের সেই অলৌকিক বিশ্বাস আর প্রার্থনার জোর যে কতটা শক্তিশালী, তা টটেনহ্যামে থাকার সময় আরও একবার প্রমাণিত হলো। ক্লাব ফুটবলে পাওয়া গুরুতর চোটের পর যখন কুটির বিশ্বকাপ খেলাই অনিশ্চিত ছিল, তখনো মা রোসা বিশ্বাস হারাননি। তিনি জানতেন, তার ছেলে ঠিক সময়েই সুস্থ হয়ে উঠবে। মায়ের সেই ভবিষ্যৎবাণী অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে কুটি শুধু বিশ্বকাপ দলেই জায়গা করে নেননি, বরং আলবিসেলেস্তেদের রক্ষণভাগের প্রধান সেনাপতি হয়ে উঠেছেন।
গ্রুপ পর্বে ইউরোপীয় প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ম্যাচে কিছুটা শারীরিক অস্বস্তির কারণে সাবধানতাবশত জর্ডান ম্যাচে সাইডলাইনে বসে থাকতে হয়েছিল কুটিকে। তবে কানসাসের অনুশীলনে এখন পুরোদমে ঘাম ঝরাচ্ছেন তিনি। কেন কোচ লিওনেল স্কালোনির জন্য কুটি এত অপরিহার্য, তা গ্রুপ পর্বের প্রথম দুই ম্যাচের পরিসংখ্যান দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। প্রতিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়ায় (রিকভারি) কুটি ছিলেন অনন্য; রেকর্ড ১৩ বার বল পুনরুদ্ধার করে তিনি আছেন দলের শীর্ষে, যেখানে আলেক্সিস মাক আলিস্তের ১১টি এবং ফাকুন্দো মেদিনা ও নাহুয়েল মলিনা করেছেন ৮টি করে।
শুধু তা-ই নয়, প্রতিপক্ষের আক্রমণ বুক দিয়ে ঠেকিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রেও কুটি রাজত্ব করছেন, তার ব্লকের সংখ্যা ১০টি! বিশেষ করে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে একাই ৬টি রিকভারি এবং ৭টি ব্লক করে আর্জেন্টাইন রক্ষণভাগকে একাই টেনেছেন এই কর্ডোবান তারকা। ট্যাকলিংয়ের দিক থেকেও এনসো ফের্নান্দেসের সাথে যৌথভাবে ৯টি ট্যাকল নিয়ে শীর্ষে আছেন তিনি। পাশাপাশি প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার (ডাইরেক্ট প্রেসার) ক্ষেত্রে মাক আলিস্তেরের (১৫) ঠিক পেছনেই ১১টি প্রেসার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে আছেন কুটি।
নকআউটের এই ‘বাঁচা-মরার’ লড়াইয়ে কেপ ভার্দের বিপক্ষে কুটির মতো একজন দুর্দান্ত ডিফেন্ডারকে পাওয়া স্কালোনির জন্য মেঘ না চাইতেই জল। যদিও কুটি নিজে হুঙ্কার দিয়ে রেখেছেন যে তিনি ‘তিন-চার দিনের মধ্যেই’ মাঠে নামতে শতভাগ প্রস্তুত, তবু স্কালোনি তাকে নিয়ে তাড়াহুড়ো করতে চান না। ম্যাচের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত কুটির শুরুর একাদশে থাকা নিয়ে জল্পনা-কল্পনা চলবে। তবে মাঠের আসল লড়াই শুরু হওয়ার আগেই, মায়ের বিশ্বাস আর কুটির অদম্য ইচ্ছাশক্তির ভেতরের লড়াইটা কিন্তু ইতিমধ্যেই জেতা হয়ে গেছে!
তথ্যসূত্র: ওলে