কাগজে-কলমে তার নাম এদিলসন আলবার্তো মন্তেইরো সানচেস বোর্হেস হলেও ফুটবল দুনিয়া তাকে চেনে এক নামে- ‘দিনি’। ৩১ বছর বয়সী এই অভিজ্ঞ ডিফেন্ডারই এবার বিশ্বকাপে কেপ ভার্দের রক্ষণভাগের আসল চাবিকাঠি। গায়ে ৩ নম্বর জার্সি চাপিয়ে গ্রুপ পর্বে যিনি ফেরান তোরেস আর ওইয়ারজাবালের মতো স্প্যানিশ তারকাদের পকেটে পুরেছিলেন, পর্তুগাল থেকে সৌদি আরব ঘুরে বেড়ানো সেই দিনিই এবার মায়ামিতে আর্জেন্টিনার বিশ্বখ্যাত আক্রমণভাগকে বোতলবন্দী করার গুরুদায়িত্ব পেয়েছেন।
আর্জেন্টাইন শিবিরের বিলাসবহুল হোটেলের ধারেকাছেও নেই কেপ ভার্দে। ম্যাচ ভেন্যু থেকে প্রায় ৪০০ কিলোমিটার দূরে ট্যাম্পার এক সাদামাটা স্পোর্টস কমপ্লেক্সে কোনো রকমে চলছে তাদের অনুশীলন, যেখানে সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার ঝলকানি নেই বললেই চলে। আর্জেন্টিনার আকাশচুম্বী ‘ফেভারিট’ তকমা নিয়ে ক্রীড়া দৈনিক ‘ওলে’-কে দেওয়া এক খোলামেলা সাক্ষাৎকারে দিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, তারা মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে শুধু হাওয়া খেতে বা লিওনেল মেসির অটোগ্রাফ নিতে আসছেন না।
গ্রুপ পর্বের ইতিহাস নিয়ে দিনি বলেন, আমরা যে কী ইতিহাস গড়েছি, তা হয়তো আরও কয়েক বছর পর পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারব। তবে ফুটবল অতীত নিয়ে পড়ে থাকার জায়গা নয়। সৌদি আরবের সাথে ড্রয়ের রাতেই আমাদের উদযাপন শেষ, কারণ অতীতে মজে থাকলে ভবিষ্যৎ আপনাকে এসে চবল দেবে।
বিশ্বসেরা দলটির বিপক্ষে রণকৌশল নিয়ে বলতে গিয়ে এই ব্লু শার্ক তারকা জানান, প্রতিপক্ষ স্পেন, উরুগুয়ে কিংবা আর্জেন্টিনা যা-ই হোক না কেন, তাদের ডিএনএ বদলাবে না। কেপ ভার্দের মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্যই হলো সাহস। তবে যখন প্রশ্ন এলো ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসিকে নিয়ে, দিনি অকপটে স্বীকার করলেন, তার বিপক্ষে খেলা এক বিশাল সম্মান ও সৌভাগ্যের ব্যাপার। তবে রেফারি বাঁশি বাজানোর পর মাঠে মেসি নামের কোনো ম্যাজিক থাকবে না, থাকবে শুধু আমাদের দায়িত্ব। আমি আশা করি শুক্রবারের ম্যাচে মেসির ওপর সেই চিরচেনা ‘ঐশ্বরিক ভর’ হবে না এবং আমরা ম্যাচ শেষে হাসিমুখেই মাঠ ছাড়ব।
মেসিকে আটকানোর কোনো গোপন মন্ত্র আছে কি না, এমন প্রশ্নে দিনি বেশ রসিয়েই জবাব দিলেন। তার মতে, শুধু মেসিকে নিয়ে পড়ে থাকা হবে এক আত্মঘাতী ভুল। তিনি প্রশ্ন তোলেন, আচ্ছা, আমরা যদি জানপ্রাণ দিয়ে মেসিকে আটকে রাখি, তাহলে হুলিয়ান আলভারেস কী করবে? লাউতারো মার্তিনেস বা এনসো ফের্নান্দেসদের কে থামাবে? আর্জেন্টিনায় কোয়ালিটি খেলোয়াড়ের অভাব নেই। তাই আমাদের লড়তে হবে একটা পরিবার হয়ে। আর মেসির বিপক্ষে ‘সেরা পারফরম্যান্স’ ঠিক কাকে বলবেন? দিনি হাসিমুখে ছুড়ে দিলেন এক লাইনের হুঙ্কার, পরবর্তী রাউন্ডে কোয়ালিফাই করা!
তীব্রতা, একতা আর বিনয়- এই তিন অস্ত্রেই ভর করে রূপকথা লিখছে কেপ ভার্দে। আর মাঠের বুক চিতিয়ে করা তাদের ‘১%’ উদযাপনের রহস্যটাও ফাঁস করলেন দিনি। তিনি বলেন, বিশ্বকাপে আসার পর সবাই বলেছিল আমাদের কোনো সুযোগ নেই। কিন্তু আমাদের নীতি হলো, যদি জেতার মাত্র ১ শতাংশ সুযোগও থাকে, আমরা আমাদের পুরো আত্মা, হৃদয় আর জীবন বাজি রেখে সেই ১ শতাংশের পেছনেই ছুটব। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে ম্যাচেও আমাদের জেতার সুযোগ হয়তো মাত্র ১%। কিন্তু আমাদের সাথে আছে ৯৯% আত্মবিশ্বাস ও সৃষ্টিকর্তার ওপর ভরসা। এখন দেখার বিষয়, মায়ামির মাঠে আর্জেন্টিনার ৯৯ শতাংশ দাপটের সামনে কেপ ভার্দের এই ১ শতাংশের জেদ কোনো নতুন ইতিহাস লেখে কি না!