বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের ম্যাচে ইংল্যান্ডের কাছে হেরে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ডিআর কঙ্গো। কিন্তু সেই হারকেও ছাপিয়ে কঙ্গোর ডাগআউটে জন্ম নিয়েছে এক বুকফাটা কান্না আর চরম পেশাদারিত্বের এক অবর্ণনীয় গল্প। দলটির ফরাসি কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে এখন পার করছেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও অন্ধকার সময়, যার সাথে মাঠের ফুটবলীয় পরাজয়ের কোনো সম্পর্ক নেই।
ম্যাচের ঠিক আগেই এই ফরাসি মাস্টারমাইন্ড জানতে পারেন তাঁর পিতার মৃত্যুর খবর। এমন এক বিধ্বংসী সংবাদে যে কোনো মানুষের ভেঙে পড়াই স্বাভাবিক, কিন্তু দেসাব্রে দেখালেন অন্য ধাতুর পেশাদারিত্ব। দলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচের আগে খেলোয়াড়দের মানসিক মনোযোগ যাতে বিন্দুমাত্র নষ্ট না হয়, সেজন্য এই শোক বুকে চেপে পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণ গোপন রাখেন তিনি। ছেলেদের টেরই পেতে দেননি যে, তাঁর মাথার ওপর থেকে এক বিশাল ছায়া সরে গেছে।
মাঠে কঙ্গোর ফুটবলাররা জানপ্রাণ দিয়ে লড়ে ইংল্যান্ডকে একপ্রকার কাঁপিয়ে দিয়েছিল। রূপকথার খুব কাছাকাছি গিয়েও শেষ পর্যন্ত হারের তিক্ততা নিয়ে মাঠ ছাড়তে হয় তাদের। ম্যাচের পর নিয়মমাফিক সংবাদ সম্মেলনে আসেন কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রে।
তখনো উপস্থিত সাংবাদিকদের কেউ জানতেন না পর্দার আড়ালের সেই ট্র্যাজেডি। দেসাব্রে বেশ স্বাভাবিকভাবেই সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তর দেয়া শুরু করেছিলেন। কিন্তু সংবাদ সম্মেলনের মাঝপথে হুট করেই কঙ্গো দলের প্রেস অফিসার এক অদ্ভুত ও আনাড়ি কাণ্ড ঘটিয়ে বসেন। তিনি আচমকা কোচের কথা থামিয়ে দিয়ে মাইকে ঘোষণা করেন, আর কোনো প্রশ্ন? ধন্যবাদ, তবে আমাদের জানাতে হচ্ছে যে কোচ তাঁর বাবাকে হারিয়েছেন। আমাদের পক্ষ থেকে আন্তরিক সমবেদনা।
প্রেস অফিসারের এমন হুটহাট ও সংবেদনশীলতাহীন ঘোষণায় মুহূর্তের মধ্যে থমকে যায় পুরো সংবাদ সম্মেলন কক্ষ। নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত শোক এভাবে জনসমক্ষে চলে আসায় দৃশ্যতই প্রচণ্ড অস্বস্তিতে পড়েন দেসাব্রে। তিনি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে শুধু এটুকুই বলেন, ধন্যবাদ।
এরপর একরাশ বিস্ময় আর স্তব্ধতার আবহ তৈরি করে তিনি প্রেস কনফারেন্স রুম ছেড়ে বেরিয়ে যান। যে খবরটি দলের বৃহত্তর স্বার্থে এবং নিজের প্রাইভেসির কারণে দেসাব্রে নিজে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন, তা মিডিয়া ম্যানেজারের এক অপেশাদার ঘোষণায় এভাবে প্রকাশ পেয়ে যাওয়াটা ফুটবল অঙ্গনে বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। পিতার মৃত্যুর পাহাড়সম শোক আড়াল করে কঙ্গোর জন্য দেসাবের এই আত্মত্যাগ ফুটবল ইতিহাসের পাতায় এক অনন্য নজির হয়ে থাকবে।