আটলান্টিকের বুকে ভেসে থাকা দশটি আগ্নেয় দ্বীপের এক ছোট্ট আফ্রিকান দেশ কেপ ভার্দে। সেনেগাল উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই দ্বীপপুঞ্জের জনসংখ্যা মাত্র লাখ পাঁচেক, তবে এর চেয়ে দ্বিগুণ-ত্রিগুণ মানুষ ছড়িয়ে আছেন বিশ্বজুড়ে প্রবাসী হিসেবে।
এই প্রবাসী আর দ্বীপবাসীদের হৃদয়ে এখন বইছে এক অভূতপূর্ব আবেগ, কারণ তাদের ফুটবল দল ‘ব্লু শার্কস’ (নীল হাঙর) সব বৈরিতা আর ইতিহাসকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে প্রথমবার জায়গা করে নিয়েছে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে! আর শনিবার ভোরে মায়ামির বিলাসবহুল হার্ড রক স্টেডিয়ামে তাদের প্রতিপক্ষ স্বয়ং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা। বিশ্বমঞ্চের এই রূপকথা যেন কেপ ভার্দের স্বাধীনতার মতোই এক পরম প্রাপ্তি।

কেপ ভার্দের এই ফুটবল রূপকথা কিন্তু এক দিনে গড়ে ওঠেনি। ১৯৭৫ সালে পর্তুগিজ উপনিবেশ থেকে মুক্ত হওয়ার পর দেশটির ফুটবল ছিল চরম অপেশাদার। ১৯৭৯ সালে আমিলকার কাব্রাল কাপে সেনেগালের বিপক্ষে এক ম্যাচে পর্তুগিজ ঘরানার আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে গিয়ে তারা রেকর্ড ‘৪০ বার অফসাইড’ হওয়ার এক অবিশ্বাস্য ও অনাকাঙ্ক্ষিত কীর্তি গড়েছিল, যাকে ফুটবল পণ্ডিতরা রসিকতা করে সিজার লুইস মেনত্তির আত্মঘাতী ডিফেন্সিভ ট্যাকটিক্সের সাথে তুলনা করেছিলেন!
তবে ২০০০ সালে এসে এই আসরেই সেনেগালকে ১-০ গোলে হারিয়ে নিজেদের ইতিহাসের একমাত্র অফিশিয়াল ট্রফি জেতে তারা। সেই দলের অন্যতম ডিফেন্ডার ছিলেন বুবিস্তা, যিনি আজ দলটির প্রধান কোচের দায়িত্বে আছেন।
এক সময় কেপ ভার্দের ঘরোয়া ফুটবল এতটাই অর্থসংকটে ছিল যে, চ্যাম্পিয়ন দল আফ্রিকার চ্যাম্পিয়ন্স লিগে খেলার বিমান ভাড়াটুকুও জোগাড় করতে পারত না। খেলোয়াড়দের খোলা ট্রাকে করে অনুশীলনে নিয়ে যেতে হতো। কিন্তু এই চরম দারিদ্র্য আর খরাক্লিষ্ট দেশটি ফুটবলকে আন্তর্জাতিকীকরণের জন্য এক অনন্য কৌশল নেয়। তারা পর্তুগাল, ইউরোপ ও আমেরিকায় ছড়িয়ে থাকা তাদের প্রবাসী ফুটবলারদের জাতীয় দলে টানতে শুরু করে। আর তাতেই বদলে যায় দৃশ্যপট।

দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে দলটির সাথে থাকা প্রবীণ সাংবাদিক মোইসেস এভোরা, যিনি এক সময় জিপের ওপর দাঁড়িয়ে বা খোলা আকাশের নিচে ধারাভাষ্য দিয়েছেন, আজ যুক্তরাষ্ট্রের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গ্যালারিতে বসে বিশ্বকাপের ম্যাচ সম্প্রচার করছেন। ক্যামেরুনের এক সহকারী কোচের দেওয়া ‘টুবাকোয়েস আজুইস’ বা ‘ব্লু শার্কস’ ডাকনামটি তিনিই বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দেন। পরে, অবশ্য কেপ ভার্দের সরকার সামুদ্রিক পরিবেশ ও হাঙর সংরক্ষণের এক রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের অংশ হিসেবে এটিকে অফিশিয়াল স্বীকৃতি দেয় এবং অন্যান্য খেলার দলের নামও টাইগার শার্কস বা হোয়াইট শার্কস রাখে!
২০১৪ বিশ্বকাপে ফিফা নিষেধাজ্ঞার কারণে বাদ পড়া এবং ২০২৩ সালে আলজেরিয়ার কাছে ১-৫ গোলে বিধ্বস্ত হওয়া কেপ ভার্দে এবারের বিশ্বকাপে এক নতুন পরাশক্তি। গ্রুপ পর্বে কেভিন পিনার দুর্দান্ত ফ্রি-কিক উরুগুয়ের জাল কাঁপিয়ে তাদের এই ঐতিহাসিক যাত্রার সূচনা করে।
দেশটির শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক আলিরিও দিয়াস দে পিনা ও রাষ্ট্রপতি জোসে মারিয়া নেভেসের মতে, এই বিশ্বকাপ যাত্রা কেপ ভার্দের জন্য ১৯৭৫ সালের স্বাধীনতা কিংবা ১৯৯১ সালের প্রথম গণতান্ত্রিক নির্বাচনের মতোই এক ঐতিহাসিক জাতীয় বিপ্লব।
ম্যাচ নিয়ে সাংবাদিক মোইসেস এভোরা বেশ রোমাঞ্চের সাথেই ওলে-কে বলেন, ১৯৭৮ সালে সাদাকালো টিভিতে কেম্পেস, পাসারেলাদের দেখেছিলাম। পরে ম্যারাডোনার সেই মহাকাব্যিক গোল দেখেছি। আজ সেই আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়া আমাদের জন্য এক পরম সম্মান। তবে আমাদের হারানোর কিছু নেই, আমরা ভয় না পেয়ে নিজেদের রণকৌশল নিয়েই মাঠে নামব। সব চাপ আর্জেন্টিনার ওপর।

কেপ ভার্দের জাতীয় খাবার ‘কাচুপা’ যেমন দাসদের তৈরি করা এক অর্থনৈতিক ও পুষ্টিকর স্টু, যা ধিমে আঁচে রান্না হয়ে আজ পুরো জাতিকে এক সুতোয় বেঁধেছে, তাদের ফুটবলটাও যেন ঠিক তেমনই এক ধিমে আঁচে তৈরি হওয়া মহাকাব্য। তাদের যাপিত জীবনের দর্শন হলো ‘মোরাবেজা’ যা অপরিচিতদের প্রতি আতিথেয়তা ও পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা দেয়।
মায়ামিতে লিওনেল মেসির আলবিসেলেস্তেদের সামনে হয়তো কাগজ-কলমে তারা আন্ডারডগ, দুই ঘণ্টা পর হয়তো তারা শুধুই এক ইতিহাস হয়ে যাবে; তবে, কেপ ভার্দের ক্রেওল ভাষায় একটি বহুল প্রচলিত গান ও প্রবাদ আছে- ‘নস ওড়া দ্যা তক্সিগা’, যার অর্থ ‘আমাদের সময় চলে এসেছে’। বুকভরা আশা আর আটলান্টিকের বিশালতা নিয়ে মাঠের লড়াইয়ে নীল হাঙররা শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত লড়তে প্রস্তুত।
