বিশ্বকাপে নকআউটের মহরণ শুরুর আগেই আর্জেন্টিনার থিংক-ট্যাংকে এখন একটাই আলোচনা, কীভাবে ভাঙা যাবে আফ্রিকার বিষ্ময় ‘কেপ ভার্দে’র রক্ষণভাগের দুর্ভেদ্য প্রাচীর? আর্জেন্টাইন ক্রীড়া সাময়িকী ওলে’র কৌশলগত বিশ্লেষক ভিসেন্তে মুগলিয়ার ট্যাকটিক্যাল বোর্ডে উঠে এসেছে কেপ ভার্দের খেলার ধরন এবং লিওনেল স্কালোনির জন্য কিছু জরুরি পরামর্শ।
প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে এসেই স্পেন (০-০) ও উরুগুয়ের (২-২) মতো পরাশক্তিদের রুখে দিয়ে গ্রুপ রানার্সআপ হয়ে নকআউটে উঠে এই দেশ। আর শনিবার ভোরে মায়ামির মাঠে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিপক্ষেও যে তারা একই ‘বাস পার্কিং’ বা রক্ষণাত্মক কৌশল নিয়ে নামবে, তা একপ্রকার নিশ্চিত।
কঙ্গো বংশোদ্ভূত কোচ পেদ্রো ব্রিতো ওরফে বুবিস্তা কেপ ভার্দে দলকে একটি সুনির্দিষ্ট সুশৃঙ্খল ছকে বেঁধে ফেলেছেন, যা ফুটবলীয় ভাষায় ‘অপারেশন ফানেল’ নামে পরিচিত। কাগজ-কলমে তারা ৪-১-৪-১ ফর্মেশনে খেলা শুরু করলেও বল যখন প্রতিপক্ষের পায়ে থাকে, তখন তা নিমেষেই রূপ নেয় অতি রক্ষণাত্মক ৪-৫-১ বা ৫-৪-১ ছকে।
তাদের দুই উইঙ্গার তখন নিচে নেমে ফুল-ব্যাকের ভূমিকা নেন এবং মাঝমাঠের প্রধান স্তম্ভ কেভিন পিনা পুরো রক্ষণভাগকে একটি দুর্ভেদ্য প্রাচীরে পরিণত করেন। স্পেন তাদের ম্যাচে পজেশন ধরে রাখলেও লুইস দে লা ফুয়েন্তে পেদ্রিকে আক্রমণাত্মক পজিশনে খেলিয়ে এই দেয়াল ভাঙার চেষ্টা করেছিলেন।
কিন্তু কেপ ভার্দের কমপ্যাক্ট ডিফেন্সের কারণে পেদ্রি বল পায়ে ঘোরার জায়গাটুকুই পাননি। পরে স্পেন ফুল-ব্যাক কুকুরেলাকে দিয়ে ভেতরে ক্রস ফেলার চেষ্টা করলেও কাজ হয়নি। অন্যদিকে উরুগুয়ে কোচ মার্সেলো বিয়েলসা দুই উইং ব্যবহার করে রেকর্ড ২৯টি ক্রস ফেলেও খুব একটা সুবিধা করতে পারেননি।
তাহলে স্কালোনির আর্জেন্টিনা কীভাবে ভাঙবে এই প্রাচীর? আর্জেন্টিনা ইতিমধ্যেই গ্রুপ পর্বে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া ও জর্ডানের মতো রক্ষণাত্মক দলের মুখোমুখি হয়েছে। জর্ডানের বিপক্ষে বেঞ্চের খেলোয়াড়দের কারণে খেলা কিছুটা ধীরগতির হলেও স্কালোনির আসল শক্তি হলো বলের দ্রুত সঞ্চলন, পজেশন ধরে রাখা এবং পাসের জটিল জাল বোনা।
কেপ ভার্দেকে বোকা বানাতে মাঝমাঠ থেকে থ্রু পাস বাড়াতে হবে এনজো বা অ্যালিক্সিসদের, যা খুঁজে নেবে লাইনের মাঝে ফাঁকা জায়গায় ওত পেতে থাকা থিয়াগো আলমাদা কিংবা স্বয়ং লিওনেল মেসিকে। যেহেতু কেপ ভার্দে তাদের বক্সে জটলা পাকিয়ে বসে থাকে এবং প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডারদের ওপর বেশি হাই-প্রেস করে না, তাই আর্জেন্টিনার ডিফেন্ডারদের সামনে মাঝমাঠ থেকে নিখুঁত লং-বল বা উঁচু পাস দেওয়ার সুযোগ থাকবে। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের পেছনের খালি জায়গায় মেসির নিখুঁত ক্রসিং এবং তরুণ ফরোয়ার্ডদের অতর্কিত দৌড় কেপ ভার্দেকে স্তব্ধ করে দেওয়ার সবচেয়ে বড় অস্ত্র হতে পারে।
তবে রক্ষণ সামলালেও কেপ ভার্দে কিন্তু পাল্টা আক্রমণে মারাত্মক বিপজ্জনক। মাঝমাঠে বল কেড়ে নিয়ে তাদের দুই গতিময় উইং-ব্যাক রায়ান মেন্ডেস ও উইলি সেমেদো চোখের পলকে কাউন্টার-অ্যাটাক করতে ওস্তাদ। সৌদি আরবের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে এই কৌশলেই তারা সফল হয়েছিল। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে বল পজেশন কম থাকলেও তারা সুযোগের অপেক্ষায় থাকবে।
আর্জেন্টিনার পরীক্ষা নিতে কেপ ভার্দের গোলপোস্টে থাকবেন ৪০ বছর বয়সী অতন্দ্র প্রহরী ভোজিনহা, যিনি স্পেনের বিপক্ষে ৭টি অতিমানবীয় সেভ করে ম্যাচের সেরা হয়েছিলেন। রক্ষণভাগে পিকু লোপেস ও ডিসনে-র থাকা নিশ্চিত হলেও দুই ফুল-ব্যাক পজিশন নিয়ে কিছুটা ধোঁয়াশা রয়েছে।
মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ থাকবে কেভিন পিনার হাতে, যার ঠিক সামনে খেলবেন অধিনায়ক রায়ান মেন্ডেস, লারোস দুয়ার্তে ও জামিরো মন্তেইরো। আর স্ট্রাইকার হিসেবে ডাইলন লিভরামেন্তো খেলবেন নাকি জিলসন তাভারেস কিংবা নুনো দা কস্তা নামবেন, তা ম্যাচ শুরুর আগেই জানা যাবে। ‘স্কালোনেতা’র টিকিটাকা পাসিং ফুটবল বনাম আফ্রিকার নীল হাঙরদের জমাট রক্ষণ, শনিবার ভোরের ম্যাচে যে একটি জমজমাট ট্যাকটিক্যাল লড়াই দেখতে যাচ্ছে ফুটবল বিশ্ব, তা বলাই বাহুল্য!