বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে খেলা ব্রাজিলের জন্য কোনো নতুন ব্যাপার নয়। ১৯৬৬ সালের পর থেকে সেলেসাওরা কখনোই গ্রুপ পর্ব থেকে বিদায় নেয়নি, আর ১৯৯০ সালের পর থেকে প্রতি চার বছরে অন্তত কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত তাদের পৌঁছানোটা যেন এক অলিখিত নিয়ম।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের কাছ থেকে এমন রেকর্ডই তো প্রত্যাশিত! কিন্তু রোমান্টিক ফুটবলপ্রেমীদের মনে এখন একটাই বড় খটকা, সেই চেনা ধারালো, চোখ ধাঁধানো আর কোমর দোলানো সাম্বা ফুটবল কি সত্যিই হারিয়ে গেছে? নাকি পেলের সেই ‘জোগা বোনিতো’ এখন শুধুই অতীতের নস্টালজিয়া?
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের ক্রীড়া লেখকদের কথায় উঠে এসেছে ব্রাজিল ফুটবলকে নিয়ে বর্তমান দুনিয়ার মিশ্র অনুভূতি।
বিশ্বজুড়ে ব্রাজিলের রাজকীয় ইমেজ: আমেরিকা থেকে শুরু করে অস্ট্রেলিয়া, ফুটবলকে যারা খুব একটা পাত্তা দেয় না, তারাও হলুদ জার্সি দেখলে নড়েচড়ে বসে। মার্কিন মুলুকের সাম বোর্ডেনের মতে, সাধারণ আমেরিকানদের কাছে ফুটবল মানেই ব্রাজিল। প্রবীণদের মনে এখনো পেলে গেঁথে আছেন, আর তরুণেরা বুঁদ হয়ে আছে নেইমার কিংবা ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের জাদুতে।
মেক্সিকোতে তো আবার অদ্ভুত এক সমীকরণ! লিজির ভাষায়, মেক্সিকানরা নিজেদের দেশ বাদ পড়লেই ব্রাজিলের সমর্থক বনে যায়। ওদিকে ব্রিটেনের টম হ্যামিল্টন মনে করিয়ে দিলেন, ফুটবল রোমান্টিকতার সাথে জিকো বা রোনালদোর নাম চিরকালের জন্য জড়িয়ে গেছে।
এমনকি ক্যাঙ্গারুর দেশ অস্ট্রেলিয়াতেও, যেখানে ক্রিকেট বা রাগবির দাপট বেশি, সেখানেও কেউ ফুটবলের সেরা দলের নাম জিজ্ঞেস করলে অবলীলায় মুখ থেকে বেরিয়ে আসে, ‘ব্রাজিল’। স্পেনের লুইস বু’র চোখে ব্রাজিল মানেই- সাম্বা, সমুদ্র সৈকত, আনন্দ আর খাঁটি ফুটবল।
মাঠের সেই জাদু এখন অনেকটাই ফিকে: কিন্তু বর্তমান দলটিকে নিয়ে ফ্রান্সের জুলিয়েন লাউরেন্সের মন্তব্য বেশ কড়া। তার মতে, আক্রমণভাগের প্রতিভার বিচারে এটি ব্রাজিলের সেরা প্রজন্ম মোটেও নয়। বর্তমান দল থেকে একমাত্র ভিনিসিয়ুস জুনিয়রই শুধু নব্বইয়ের দশকের সেই কিংবদন্তি দলগুলোতে জায়গা পাওয়ার যোগ্যতা রাখেন।
স্পেনের লুইসের মতে, ব্রাজিল এখন তাদের নিজস্ব ফুটবল সংস্কৃতি থেকে দূরে সরে গেছে। অসাধারণ প্রতিভার অভাব, অতিরিক্ত মাত্রায় প্রাগম্যাটিক বা রক্ষণাত্মক কোচের নিয়োগ এবং যেকোনো মূল্যে শুধু জেতার তাড়না আজকের ব্রাজিলকে কেমন যেন ‘কম ব্রাজিলীয়’ করে তুলেছে।
আর্জেন্টিনা যেখানে মাঠ কামড়ে ‘গ্রিট’ বা জেদ নিয়ে খেলে, স্পেন খেলে টিকিটাকা; সেখানে ব্রাজিলের জিততে প্রয়োজন ছিল সেই হারিয়ে যাওয়া জাদু। আর সেই জাদুর অভাবই প্রতিপক্ষদের এখন সাহস বাড়িয়ে দিচ্ছে। তারা এখন আর ব্রাজিলকে আগের মতো ভয় পায় না, বরং ভাবতেই শুরু করেছে, এই ব্রাজিলকে তো হারানো সম্ভব!
তবুও অনন্য, তবুও অপ্রতিদ্বন্দ্বী: ২০০২ সালের পর এক প্রজন্ম পার হয়ে গেলেও ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ‘আভা’ কি পুরোপুরি শেষ? মেক্সিকান লেখিকা লিজির উত্তর, ‘নাহ!’ পেলে-রোনালদোহীনের এই দলেও এখনো দেখার মতো ফুটবলার আছে। ফুটবলের প্রতি ব্রাজিলের যে চিরন্তন আবেগ, সেটাই তাদের টিকিয়ে রেখেছে। ওদিকে অস্ট্রেলিয়ার জয়ের মতো, ফুটবলপ্রেমীরা এখনো বিশ্বকাপ মাঠে ব্রাজিলের খেলা থাকলে সব কাজ ফেলে টেলিভিশনের সামনে বসে পড়ে।
আর্জেন্টিনা কিংবা ফ্রান্স হয়তো কিছুটা কাছে আসার চেষ্টা করছে, মেসির বিশ্বকাপ জয় আর্জেন্টিনাকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে, কিন্তু ব্রাজিলের সেই ঐতিহাসিক মাহাত্ম্য ছোঁয়ার সাধ্য কারো নেই। ফরাসি সাংবাদিক জুলিয়েন লাউরেন্সের রসালো এক লাইনের খোঁচায় বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়, ব্রাজিলই হলো বিশ্বকাপ, আর বিশ্বকাপই হলো ব্রাজিল। এটা শুধু পাঁচবার ট্রফি জেতার জন্য নয়, বরং এই টুর্নামেন্টের সাথে তাদের আত্মার যে বন্ধন, তা অন্য কারো নেই।
রোনালদোর সেই বিখ্যাত হেয়ারস্টাইল, বেবেতোর ‘রক দ্য বেবি’ উদযাপন কিংবা রোনালদিনহোর অতিমানবীয় ফ্রি-কিক, ব্রাজিলের ফুটবল মানেই তো উৎসবের কার্নিভাল। বর্তমান দলটা হয়তো বড্ড বেশি যান্ত্রিক আর কৌশলের বেড়াজালে বন্দি, কিন্তু হলুদ জার্সির সেই অতিপ্রাকৃতিক টান এখনো ফুটবল দুনিয়াকে মোহাবিষ্ট করে রাখার জন্য যথেষ্ট!