বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচেই মরক্কোর সাথে ড্র করে যখন ব্রাজিলের গ্রুপ পর্বের যাত্রা শুরু হয়েছিল, তখন কড়া সমালোচকেরা নাক সিটকে বলেছিলেন, এই দল দিয়ে কিচ্ছু হবে না! কিন্তু কার্লো আনচেলত্তির শিষ্যরা পরের ম্যাচগুলোতে যেভাবে মাঠ কাঁপিয়ে পারফর্ম করেছে, তাতে পুরো দৃশ্যপটই বদলে গেছে।
ব্রাজিলিয়ানদের মনের জমে থাকা বরফ গলে এখন সেখানে বইছে হেক্সা (ষষ্ঠ বিশ্বকাপ) জয়ের তীব্র হাওয়া। সম্প্রতি ‘কুয়েস্ট’ ও ‘ব্রাহমা’র যৌথ উদ্যোগে করা এক নতুন জরিপ বলছে, দেশের ৫৬ শতাংশ মানুষ এখন বিশ্বাস করে, এবার ট্রফি ব্রাজিলেই যাচ্ছে! গত তিন বছরের মধ্যে এটিই ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে সাধারণ মানুষের সর্বোচ্চ আত্মবিশ্বাসের রেকর্ড।
এই জরিপের ফলাফলকে আসলে ইতালীয় মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তির শুরুর কৌশলের প্রতি ব্রাজিলিয়ানদের একপ্রকার ‘সবুজ সংকেত’ বা সিলমোহর হিসেবেই দেখা হচ্ছে। কারণ, টুর্নামেন্ট শুরুর ঠিক আগে মে মাসে যখন এই জরিপ করা হয়েছিল, তখন মাত্র ৪২ শতাংশ মানুষ ব্রাজিলের জেতার ওপর বাজি ধরেছিল। বাকি ৫৮ শতাংশ মানুষ তো সাফ জানিয়ে দিয়েছিল— এবার কোনো সুযোগই নেই!
জুন মাসের শেষে এসে গ্রুপ পর্বের লড়াই শেষ হতেই সেই অবিশ্বাস কর্পূরের মতো উড়ে গেছে। অথচ ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে ব্রাজিলের ফুটবল নিয়ে ভক্তদের আশা কেবলই কমছিল। ২০২৪ সালে এসে সেই আত্মবিশ্বাস তলানিতে ঠেকে মাত্র ২৮ শতাংশে নেমে গিয়েছিল। কিন্তু এক বিশ্বকাপ হাওয়াতেই সব ওলটপালট!
জরিপের সবচেয়ে আকর্ষণীয় এবং রসালো অংশটি হলো বয়সভিত্তিক পরিসংখ্যান। ব্রাজিলের ১৮ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের (জেনারেশন জেড) প্রতি ৫ জনের মধ্যে ৪ জনই (অর্থাৎ ৮০ শতাংশ) মনে করে ব্রাজিল এবার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হবেই হবে! এই তরুণদের বড় একটা অংশ ২০০২ সালের সর্বশেষ বিশ্বকাপ জয়ের আনন্দ দেখেনি। তাই নিজেদের জীবদ্দশায় ব্রাজিলকে বিশ্বমঞ্চের চূড়ায় দেখার তীব্র ক্ষুধা থেকে জন্ম নেওয়া এই 'হাইপ' পুরো দেশের মানসিকতাই বদলে দিয়েছে।
এমনকি যারা প্রতিদিন নিয়ম করে ফুটবল খেলা দেখে না, তারাও এই বিশ্বকাপ জ্বরে আক্রান্ত হয়ে এখন সাম্বা জাদুর প্রেমে মজেছে জরিপ বলছে, পুরুষদের মধ্যে হেক্সা জয়ের বিশ্বাস মে ২০২৫-এর ৪০ শতাংশ থেকে লাফিয়ে জুন ২০২৬ সালে ৬০ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। পিছিয়ে নেই নারীরাও; তাদের আত্মবিশ্বাস ৪৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫১ শতাংশে পৌঁছেছে। ব্রাজিলের ইতিহাসে এবারই প্রথম নারীদের মাঝে ফুটবল নিয়ে অবিশ্বাসের চেয়ে বিশ্বাসের পাল্লা ভারী হয়েছে (অবিশ্বাস ৫৬% থেকে কমে ৪৯%)।
কুয়েস্টের মার্কেট ইন্টেলিজেন্স ডিরেক্টর নাথালিয়া পোর্তো বেশ চমৎকারভাবে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছেন, ব্রাজিলিয়ানদের মনে জাতীয় দল নিয়ে জমে থাকা সংশয় ঠিক কোন মুহূর্তে ফুটবলের প্রতি অন্ধ ভালোবাসায় রূপ নেয়, আমরা জরিপে ঠিক সেই টার্নিং পয়েন্টটাই ধরতে পেরেছি।
২,০০০ ব্রাজিলিয়ানের ওপর চালানো এই জরিপ প্রমাণ করে, ব্রাজিলে বিশ্বকাপ শুধুই ক্যালেন্ডারের কোনো পাতা নয়, এটি একটি অদম্য সাংস্কৃতিক শক্তি। মাঠের লড়াইয়ে নেইমার-ভিনিসিয়ুসরা গোল করছেন আর মাঠের বাইরে কোটি কোটি ভক্তের মনে তৈরি হচ্ছে হেক্সা জয়ের স্বপ্ন। আনচেলত্তির এই ব্রাজিল দল শেষ পর্যন্ত ট্রফি ঘরে তুলতে পারবে কি না তা সময়ই বলবে, তবে পুরো ব্রাজিল জাতি যে এখন ‘মিশন হেক্সা’র নেশায় বুঁদ, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না!