আনচেলত্তিকে যেভাবে হারিয়ে দিলেন সলবাকেন

বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর মহারণে কার্লো আনচেলত্তির ব্রাজিলকে ২-১ গোলে বিদায় করে কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিট কেটেছে নরওয়ে। আর, এই মহাকাব্যিক জয়ের পর নরওয়েজিয়ান সংবাদমাধ্যমে এখন ধন্য ধন্য পড়ে গেছে তাদের প্রধান কোচ স্টালে সলবাকেনকে নিয়ে। নরওয়ের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘ভিজি’ সোমবার এক প্রতিবেদনে সলবাকেনের হাফটাইমের দুটি পরিবর্তনকে ‘সাহসী এবং দূরদর্শী চাল’ বলে আখ্যা দিয়েছে, যা পুরো ম্যাচের ভাগ্যই বদলে দিয়েছিল।

খেলার প্রথম ৪৫ মিনিট শেষে ড্রেসিংরুমে বসেই সলবাকেন এমন এক জুয়া খেলেন, যার জন্য ব্রাজিলের বিশ্বখ্যাত কোচ কার্লো আনচেলত্তি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না।

তিনি আন্তোনিও নুসা এবং অভিজ্ঞ আলেকজান্ডার সরলথকে উঠিয়ে মাঠে নামান দুই তরুণ তুর্কি অস্কার বব এবং আন্দ্রেয়াস শিয়েলডেরুপকে। আচমকা এই বদলি নিয়ে শিয়েলডেরুপ নিজেই ম্যাচ শেষে ‘ভিজি’-র কাছে বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, আমি প্রথমার্ধের পরেই মাঠে নামব, তা একদমই আশা করিনি। সত্যি বলতে, ওই মুহূর্তে আমি কিছুটা হতভম্ব আর অবাকই হয়ে গিয়েছিলাম।

Norway Coach Staale Solbakken 02
তবে কোচের এই ফাটকা নরওয়েকে এনে দিয়েছে পরম আরাধ্য জয়। মাঠে নেমেই ম্যান সিটি তারকা আর্লিং হলান্ডের দুই গোলের পেছনেই সরাসরি অবদান রাখেন এই শিয়েলডেরুপ; এমনকি প্রথম গোলের অ্যাসিস্টটিও আসে তাঁর পা থেকে। ম্যাচ শেষে হলান্ডের সাথে নিজের রসায়ন নিয়ে এই স্ট্রাইকার বেশ রসাল মন্তব্য করে বলেন, “বেশি মাথা খাটানোর বা চিন্তা করার কোনো দরকার নেই। শুধু বলটা ওর (হলান্ড) দিকে বাড়িয়ে দাও। তুমি আগে থেকেই জানো যে ও গোল করবেই!

সংবাদ সম্মেলনে নরওয়ে বস সলবাকেন তাঁর এই ঐতিহাসিক রণকৌশল ফাঁস করে জানান, তাঁর পরিকল্পনা খেলার গতি বাড়ানো ছিল না, বরং বল পজেশন ধরে রেখে ব্রাজিলকে ক্লান্ত করে দেওয়া ছিল। তিনি বলেন, আমরা যদি এই ম্যাচটি জিততে চাইতাম, তবে আমাদের বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা এবং লম্বা সময় ধরে আক্রমণ গোছানো খুব জরুরি ছিল। অস্কার আর আন্দ্রেয়াস এমন দুজন ফুটবলার, যারা খুব ভালো করেই বোঝে কখন খেলা দ্রুত করতে হবে আর কখন শুধু বলটা নিজেদের পায়ে ধরে রাখতে হবে।

পরিসংখ্যানও বলছে, মাঠের খেলায় সাম্বা ফুটবলারদের নাচিয়ে ছেড়েছে নর্ডিক এই দেশটি। পুরো ম্যাচে নরওয়ের বল পজেশন ছিল আকাশচুম্বী ৬৬ শতাংশ, আর ব্রাজিলের পায়ে বল ছিল মাত্র ৩৪ শতাংশ! বিশ্বকাপের ইতিহাসে ব্রাজিলের জন্য এটিই সর্বকালের সর্বনিম্ন বল পজেশনের লজ্জাজনক রেকর্ড। এর আগে ১৯৯৮ বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ব্রাজিলের ৪৪ শতাংশ পজেশনই ছিল তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বাজে পারফরম্যান্স।

সলবাকেনের এই অতিমানবীয় কোচিং পারফরম্যান্সের প্রশংসায় পঞ্চমুখ স্ক্যান্ডিনেভিয়ান সংবাদমাধ্যম ও ফুটবল পণ্ডিতেরা। ‘ভিজি’ স্টুডিওর জনপ্রিয় ফুটবল বিশ্লেষক জোয়াকিম জনসন সরাসরি দাবি করেছেন, ডাগআউটের ব্যক্তিগত দ্বৈরথে আনচেলত্তিকে রীতিমতো ধুয়ে দিয়েছেন সলবাকেন। জনসনের ভাষায়, সলবাকেন আনচেলত্তির ওপর এক বিধ্বংসী জয় তুলে নিয়েছেন। দুই কোচের খেলোয়াড় পরিবর্তনের মানের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আকাশ-পাতাল পার্থক্য! খাতা-কলমের পরিসংখ্যান আর নামের ভারে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও, সলবাকেনের চাণক্য বুদ্ধির কাছেই শেষ পর্যন্ত কাটা পড়ল সেলেসাওদের হেক্সা স্বপ্ন।