অধরা বিশ্বকাপের ট্রফি ছোঁয়া হলো না রোনালদোর

দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে যিনি একা হাতে ম্যাচের ভাগ্য গড়েছেন, রিয়াল মাদ্রিদ, ম্যান ইউ কিংবা জুভেন্টাসের হয়ে নিজের সোনালী সময় পেরিয়ে এসেও যিনি বয়সকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শাসন করেছেন বিশ্ব ফুটবলকে, সেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর বিশ্বকাপ রূপকথার অবসান হলো চরম এক ট্র্যাজেডিতে।

ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এই জাদুকরের শোকেসে ফুটবল দুনিয়ার সম্ভাব্য সব ট্রফি সাজানো থাকলেও, যে সোনালী ট্রফিটির জন্য তাঁর আজীবন হাহাকার ছিল, তা অধরাই থেকে গেল। সোমবার টেক্সাসের আর্লিংটনে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী স্পেনের কাছে ১-০ গোলে হেরে পর্তুগালের বিদায়ের সাথে সাথে ৪১ বছর বয়সী এই মহাতারকার চোখের জলেই শেষ হলো তাঁর ষষ্ঠ এবং ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপ।

Cristiano Ronaldo 01
অথচ এই ম্যাচের ঠিক একদিন আগেই বেশ ফুরফুরে মেজাজে রোনালদো ঘোষণা করেছিলেন, এটিই তাঁর শেষ বিশ্বকাপ। রোববার সংবাদ সম্মেলন শেষে যখন তিনি সাংবাদিকদের করতালির মধ্য দিয়ে বিদায় নিচ্ছিলেন, তখন জোর গলায় বলেছিলেন, নিজের এত দীর্ঘ ক্যারিয়ার নিয়ে তাঁর মনে কোনো আক্ষেপ নেই। কিন্তু সোমবারের রাতটি সব হিসেব ওলটপালট করে দিল। ম্যাচের ৯০ মিনিট পর্যন্ত লড়াই সমানে-সমানে চললেও, ৯১ মিনিটে স্পেনের মিকেল মেরিনোর সেই ‘মারাত্মক’ গোলটি পর্তুগিজদের বুকে তীরের মতো বিঁধে যায়। ম্যাচ শেষে ডাগআউটে রোনালদোর সেই চেনা কান্না ছুঁয়ে গেছে পুরো ফুটবল বিশ্বকে।

ম্যাচ শেষে পর্তুগাল কোচ রবার্তো মার্টিনেজ তাঁর অধিনায়কের এই ফুটবলপ্রেমকে কুর্নিশ জানিয়ে বলেন, এই বিশ্বকাপে ও যা করার চেষ্টা করেছে, তার জন্য আমরা আজীবন কৃতজ্ঞ থাকব। বিশ্বজয়ের যে স্বপ্ন ও বুকে লালন করেছিল, তা পূরণে ও একজন অবিশ্বাস্য অধিনায়কের মতো নেতৃত্ব দিয়েছে। ও ফুটবলের এক অনন্য আইকন। ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো পৃথিবীতে বারবার আসে না।

২০০৬ সালে মাত্র ২১ বছর বয়সে জার্মানির মাটিতে বিশ্বকাপে অভিষেক হয়েছিল রোনালদোর। সেবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে তাঁর সেই ঐতিহাসিক উইনিং পেনাল্টি শট আজও পর্তুগিজদের মনে গেঁথে আছে। সেবার সেমিফাইনালে ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেওয়াটাই ছিল বিশ্বকাপের মঞ্চে রোনালদোর সর্বোচ্চ সাফল্য। ৬টি বিশ্বকাপে মোট ২৭টি ম্যাচ খেলে ১১টি গোল করেছেন তিনি। আর কী অদ্ভুত সমাপতন, বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে রোনালদোর ক্যারিয়ারের একমাত্র গোলটি এসেছিল গত সপ্তাহে ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে, যা পর্তুগালকে শেষ ১৬-তে তুলেছিল। স্পেনের বিপক্ষে পুরো ৯০ মিনিট খেলে ৩টি শট নিলেও এবার আর কোনো ম্যাজিক দেখাতে পারেননি সিআরসেভেন।

Cristiano Ronaldo 03
তবে বিদায়বেলায় রোনালদোকে প্রশংসায় ভাসাতে কার্পণ্য করেনি প্রতিপক্ষ স্পেন শিবিরও। স্প্যানিশ কোচ লুইস দে লা ফুয়েন্তে ম্যাচ শেষে বলেন, আমি ওর মূল্যবোধ এবং ফুটবলের প্রতি ওর নিবেদনের একজন বড় ভক্ত। ও তরুণ প্রজন্মের জন্য এক আদর্শ রোল মডেল। আমাদের যখনই দেখা হয়, আমরা একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধা প্রকাশ করি।

রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ হতেই ফুটবলপ্রেমীদের মনে আবার চাড়া দিয়ে উঠছে লিওনেল মেসির সাথে তাঁর সেই মহাকাব্যিক দ্বৈরথ। মেসি যেখানে ২০১৪ সালে আর্জেন্টিনাকে ফাইনালে নিয়ে যান এবং ২০২২ সালে কাতার বিশ্বকাপে ট্রফি উঁচিয়ে ধরে ফুটবলার হিসেবে পূর্ণতা পান, সেখানে রোনালদোর বিশ্বকাপ যাত্রা বারবার শেষ হয়েছে হতাশায়। অথচ এই উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে কলম্বিয়ার পেছনে না থেকে পর্তুগাল যদি গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতো, তবে কোয়ার্টার ফাইনালে দেখা মিলতে পারত মেসি-রোনালদোর সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত ‘লাস্ট ড্যান্স’!

উজবেকিস্তানকে ৫-০ গোলে ওড়ানোর ম্যাচে জোড়া গোল করে রোনালদো নিজেও বলেছিলেন, মেসির সাথে দেখা হলে সেটা হবে একদম টপ! কিন্তু সেই যদি-কিন্তুর হিসেব আর মিলল না। ফুটবল ইতিহাসের প্রায় সব দুর্গ জয় করা এই মহানায়কের বিশ্বকাপ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল একরাশ অপূর্ণতা আর আক্ষেপের দীর্ঘশ্বাস সঙ্গী করেই।

তথ্যসূত্র: রয়টার্স