আটলান্টায় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে শেষ ষোলোর মহাযুদ্ধে নামার আগেই ফুটবল মাঠের গণ্ডি ছাড়িয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের ডাগআউটে আছড়ে পড়ল বৈশ্বিক রাজনীতির উত্তাল ঢেউ। ট্রফি বাঁচানোর লড়াইয়ে যখন লিওনেল মেসির মুখোমুখি হতে যাচ্ছে মিশর, ঠিক তখনই ফিফার সংবাদ সম্মেলনকে ফিলিস্তিনিদের পাশে দাঁড়ানোর রাজনৈতিক মঞ্চ বানিয়ে ফেললেন মিশরীয় কোচ হোসাম হাসান।
একদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশংসিত এক সিদ্ধান্তে ফোলারিন বালোগুনের লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া নিয়ে যখন ফিফার ডিসিপ্লিনারি কমিটি তীব্র সমালোচনার মুখে ডিফেন্সিভ মোডে, ঠিক তখনই হোসাম হাসানের এই ফিলিস্তিনপন্থী হুঙ্কার বিশ্বকাপের আকাশে নতুন এক বারুদের গন্ধ এনে দিয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে যখন হোসাম হাসানকে মেসির আর্জেন্টিনা দল ও তাঁদের রণকৌশল নিয়ে প্রশ্ন করা হচ্ছিল, ঠিক তখনই এক সাংবাদিক মনে করিয়ে দেন শেষ বত্রিশের ম্যাচে ডালাসে অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করার পর মিশর কোচের ফিলিস্তিনি পতাকা ওড়ানোর সেই ভাইরাল মুহূর্তটি।
মঙ্গলবার আর্জেন্টিনার বিপক্ষে কোনো অঘটন ঘটাতে পারলে আবারও সেই পতাকা উড়াবেন কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে আর চেপে রাখতে পারেননি হাসান। গাজার বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চলা নৃশংসতার কথা টেনে তিনি দীর্ঘ সময় ধরে বলেন, পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের মানুষ যদি ফিলিস্তিনিদের জন্য সহমর্মিতা অনুভব না করে, তবে তারা তাদের মানবতার একটা অংশ হারিয়ে ফেলেছে।
ফিফার কড়া নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই এই মিশরীয় মাস্টারমাইন্ড আরও যোগ করেন, আমার সেই আচরণ ছিল শুধু একজন মানুষের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। আরব, মুসলিম বা খ্রিস্টান হওয়ার আগে আমি একজন মানুষ। ফুটবলের এই ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল শক্তি ব্যবহার করে আমি বিশ্বের কাছে একটা বার্তা দিতে চাই: দয়া করে ফিলিস্তিনিদের বাঁচতে দিন। আমি বিশ্বের সব ক্রীড়াবিদ ও সাংবাদিকদের অনুরোধ করব এই বার্তাটি সবার কাছে পৌঁছে দিতে। মানুষ যখন মানবাধিকার, প্রাণীর অধিকার আর ন্যায়বিচার নিয়ে লম্বা চওড়া কথা বলে, তখন ফিলিস্তিনের বেসামরিক নাগরিকদের নিয়েও তাদের কথা বলা উচিত।
জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো গাজায় ইসরাইলি হামলাকে ‘গণহত্যা’ বলে আখ্যা দিলেও ইসরাইল তা বরাবরই অস্বীকার করে আসছে। এই তীব্র ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার মাঝে ফিফার নিয়ম অনুযায়ী জার্সিতে বা খেলার সরঞ্জামে কোনো রাজনৈতিক স্লোগান ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও, ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে কোচদের ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা খুঁজে পায়নি বার্তা সংস্থা রয়টার্স। আর সেই ফাঁক গলেই ট্রাম্প ও ফিফার ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের মুখে সপাটে চড় মারলেন হাসান।

রাজনীতির পিচ থেকে মাঠের ফুটবলে ফিরে এসে হোসাম হাসান অকপটে স্বীকার করেছেন যে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে তাঁরা ‘আন্ডারডগ’ বা দুর্বল দল হিসেবেই নামবেন, তবে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের মোটেও ভয় পাচ্ছেন না সালাহরা। হাসান হুঙ্কার দিয়ে বলেন, আমরা জানি আমরা বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়ের (মেসি) বিরুদ্ধে খেলতে যাচ্ছি, কিন্তু আমাদের মনে কোনো ভয় নেই। আমাদের কাঁধে এখন মিশর, পুরো আরব বিশ্ব এবং আফ্রিকার দায়িত্ব। আমরা এই মঞ্চে তাদের সবার প্রতিনিধিত্ব করছি।
আর এই বিশাল দায়িত্বই আমাদের নিজেদের ওপর বিশ্বাস রাখতে এবং মাঠের সেরা ফুটবলটা উপহার দিতে বাধ্য করবে। মাঠের ফুটবলীয় লড়াইয়ে মেসি-সালাহ ম্যাজিক তো থাকবেই, কিন্তু আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জে আজ রাতে আরব বিশ্বের যে আবেগ ও প্রতিবাদের আগুন নিয়ে মিশর নামছে, তা আর্জেন্টিনার ডিফেন্সের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হতে যাচ্ছে!
তথ্যসূত্র: রয়টার্স
