বিশ্বকাপ মানেই দীর্ঘ এক আসরে ঘাম ঝারানো ক্লান্তি! রাত ১০টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা-মিশর কোয়ার্টার ফাইনালের টিকিটের জন্য মুখোমুখি হবে, তখন দুই দলের সামনে প্রতিপক্ষের চেয়েও বড় এক অভিন্ন শত্রু দাঁড়িয়ে আছে, তার নাম ‘চরম ক্লান্তি’।
গেলো শুক্রবারের তীব্র দাবদাহের মাঝে দু’দলই ১২০ মিনিটের বিধ্বংসী অতিরিক্ত সময়ের ধকল পার করে এসেছে। চলতি বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে ওঠা দলগুলোর মধ্যে এই দুটি দলই বয়সের দিক থেকে অন্যতম বুড়ো। আর সেই বুড়ো হাড়ের দুই কাণ্ডারি, ৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসি এবং ৩৪ বছর বয়সী মোহাম্মদ সালাহ, আসর শুরুর আগের চোট সামলে শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে দলকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন দুজন।
ফিফার অফিশিয়াল পরিসংখ্যানের ওপর ভিত্তি করে তৈরি গ্লোবো’র একটি সমীক্ষা জানাচ্ছে, এই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি দৌড়ানো দলগুলোর মধ্যে চার নম্বরে আছে মিশর। প্রতি ম্যাচে গড়ে ১২২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিচ্ছে তারা! অন্যদিকে আর্জেন্টিনার গড় সেখানে ১১৪ কিলোমিটার।
আর্জেন্টিনার মূল চ্যালেঞ্জ হলো ৩৯ বছর বয়সী মেসিকে একটু শ্বাস নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া। সালাহর চেয়ে ৫ বছরের বড় মেসি আজ মাঠের প্রবীণতম স্টার্টার। অথচ এই বয়সেও তাঁকে ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপের মতোই খাটতে হচ্ছে, যখন তিনি ৮ বছরের তরুণ ছিলেন! সেবার ভাঙাচোরা আর্জেন্টিনায় মেসি দৌড়েছিলেন ম্যাচ প্রতি ৭.৯ কিলোমিটার। আর, এবার প্রতি ৯০ মিনিটে তাঁর গড় ৭.৭ কিলোমিটার, যা অবশ্য কাতার বিশ্বকাপের (৯ কিলোমিটার) চেয়ে কম।
মেসির চোটপ্রবণ শরীরকে বাঁচিয়ে রেখে তাঁর থেকে সেরাটা বের করতে কোচ লিওনেল স্কালোনি তাঁকে আলজেরিয়া ও জর্ডান ম্যাচে জলদি তুলে নেন। কিন্তু কেপ ভার্দের বিরুদ্ধে শেষ ম্যাচে মিয়ামির ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা আর তীব্র আর্দ্রতার মাঝে বাধ্য হয়েই মেসিকে পুরো ১২০ মিনিট মাঠে রাখতে হয়।
এর ওপর ম্যাচ ডে-র মাঝে মাত্র ৩ দিনের বিরতি এবং শনিবারে বজ্রঝড়ের কারণে অনুশীলন বাতিল হওয়ায় চরম ক্ষুব্ধ স্কালোনি। সংবাদ সম্মেলনে তাই দলের গতি কমিয়ে খেলার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি, আমাদের এত তাড়াহুড়ো না করে বল পায়ে রেখে ডিফেন্ড করতে হবে। শেষ কয়েক ম্যাচে আমরা বল কেড়ে নিয়েই বড্ড তাড়াহুড়ো করে আক্রমণে উঠছিলাম, সেটা বন্ধ করতে হবে।
ওদিকে মিশরের সালাহও ডালাসের ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস নরকগুলজার গরমে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে ১২০ মিনিটের যুদ্ধ লড়ে এসেছেন। আটলান্টায় আগেভাগে এসেও রবিবারের ঝড়-বৃষ্টির কারণে অনুশীলন বাতিল করতে হয়েছে মিশরকেও। তবে মিশরীয় কোচ হোসাম হাসান তাঁর দলের গতি কমানোর মুডে নেই।
বেলজিয়াম, কানাডা ও সেনেগালের পরেই বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি স্প্রিন্ট (ঘণ্টায় ২০ কিলোমিটারের বেশি গতিতে দৌড়ানো) দেওয়ায় চার নম্বরে আছে মিশর, ম্যাচ প্রতি ৫০২টি! হোসাম হাসানের হুঙ্কার, আবহাওয়া খারাপ, বিরতিও কম, তবে আমরা ছেলেদের ফিট করছি। আর্জেন্টিনাকে সম্মান করি, কিন্তু প্রতিপক্ষ যত শক্তিশালী হবে, আমরা তত বেশি খাটব।
সদ্য লিভারপুল ছেড়ে দেওয়া এবং এখনো কোনো নতুন ক্লাবে সই না করা সালাহ এই বিশ্বকাপে ইতিমধ্যে ৩৮ কিলোমিটার পথ কভার করেছেন। গত ম্যাচে গোল না পেলেও জিপিএস ট্র্যাকার বলছে ওয়ান-ম্যান আর্মি সালাহ একাই ১৩ কিলোমিটার দৌড়েছেন!
অবশ্য মেসি (২৭ কিমি) ও সালাহ- উভয়ই দলীয় সতীর্থদের চেয়ে কম গতিতে দৌড়ান। সালাহর যেখানে মাত্র ১৪৭টি স্প্রিন্ট, সেখানে মেসির স্প্রিন্ট সংখ্যা মাত্র ৯৬টি। গতিতে মেসি কেবল পেছনে ফেলেছেন নিচে নেমে খেলা ম্যাক অ্যালিস্টার এবং দুই ডিফেন্ডার রোমেরো ও লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে।
দুই দলেই অভিজ্ঞদের মেলা। আর্জেন্টিনার ডাগআউটে আছেন ৩৮ বছরের ওটামেন্ডি, আর ইনজুরি কাটিয়ে আজ বাঁ-হাতি ডিফেন্সে ফিরছেন ৩৩ বছরের ট্যাগলিয়াফিয়ো। মিশরের রক্ষণেও আছেন ৩৩ বছর বয়সী ইব্রাহিম ও রাবিয়া। দুই দলেরই গড় বয়স ২৮.৭ বছর, যা টুর্নামেন্টে কলম্বিয়ার (২৯.৬) পরেই সর্বোচ্চ।
এই বুড়ো স্কোয়াডের ক্লান্তি ঢাকতে স্কালোনি আক্রমণাত্মক চিলতে থিয়াগো আলমাদাকে বসিয়ে রক্ষণাত্মক ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে নামানোর ইঙ্গিত দিয়েছেন। রাতে যে দল জিতবে, কোয়ার্টারে সুইজারল্যান্ড বা কলম্বিয়ার মুখোমুখি হওয়ার আগে তারা অন্তত চার দিনের একটা জম্পেশ ছুটি পাবে শরীরটাকে জোড়া লাগানোর জন্য। এখন দেখার বিষয়, আটলান্টার গরমে মেসির মগজের চাণক্য চাল জেতে, নাকি সালাহর ফারাও বাহিনীর ফুসফুসের দম!