আর্জেন্টিনা দলের মধ্যে সংহতি যে কোন দলের জন্য ঈর্ষার কারণ হতে পারে। কারণ, এই দলের সব খেলোয়াড় এক বাক্যে মেসির পেছনে থাকেন। অন্যদিকে, মেসি থাকেন সবার ছাড়া হয়ে। কাতারের ট্রফি ঘরে তুলে লাউতারো মার্টিনেজরা বলেছিলেন, এই কাপ জিতেছেন তারা মেসির জন্য। আবার, আটবারের ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসি বলেছেন, ছেলেদের মুখের দিকে তাকিয়ে শিরোপা জিতেছেন।
এমন উদাহরণ আরও আছে। ‘আমি নিজের রেকর্ডের জন্য খেলি না, খেলি সতীর্থদের মুখে হাসি ফোটাতে’ মিক্সড জোনে দাঁড়িয়ে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে প্রায় প্রতিটি সাক্ষাৎকারেই বিনয়ের সুরে এই কথাটি আওড়ান লিওনেল মেসি।
কিন্তু বিনয় দেখালে কী হবে, মাঠের পারফরম্যান্স বলছে অন্য কথা! ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর লড়াই শেষে এই মুহূর্তে টুর্নামেন্টের এককভাবে শীর্ষ গোলদাতা আর কেউ নন, স্বয়ং ফুটবল জাদুকর লিওনেল মেসি।
চলমান বিশ্বমঞ্চে এখন পর্যন্ত তিনিই একমাত্র খেলোয়াড় যিনি নামের পাশে আটট গোল যোগ করেছেন। আলজেরিয়ার বিপক্ষে হ্যাটট্রিক (৩ গোল), অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল (২ গোল), আর জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশরের জালে ১টি করে বল পাঠিয়েছেন।
অথচ এর মাঝেই অস্ট্রিয়া ও মিশরের বিপক্ষে দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন তিনি। তা না হলে এই পরিসংখ্যান আজ আটের বদলে অনায়াসেই ১০ হতে পারত! ৫ ম্যাচের মধ্যে ৪টিতেই শুরুর একাদশে ছিলেন এবং সেই ৪ ম্যাচেই ম্যাচসেরার পুরস্কার বগলদাবা করেছেন এলএম টেন।
গোলদাতার তালিকায় ৭ গোল নিয়ে তার ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছেন কিলিয়ান এমবাপ্পে ও আর্লিং হালান্ড, আর হ্যারি কেইনের গোল সংখ্যা ৬। মজার ব্যাপার হলো, এই চার দানবই নিজ নিজ দলকে নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে টিকে আছেন, ফলে লড়াইটা এখন জমজমাট!
১৯৫৮ সালের সুইডেন বিশ্বকাপে মাত্র ৬ ম্যাচ খেলে ফরাসি কিংবদন্তি জাস্ট ফন্টেইন এক আসরে সর্বোচ্চ ১৩টি গোল করার যে অবিশ্বাস্য কীর্তি গড়েছিলেন, দীর্ঘ ৬৮ বছর ধরে সেই রেকর্ডটি অক্ষত এবং 'অসম্ভব' রয়ে গেছে। কিন্তু ২০২৬ সালে এসে লিওনেল মেসি যেন সেই ইতিহাসকেও নতুন করে লেখার হুমকি দিচ্ছেন। ফন্টেইনের রেকর্ড ছুঁতে মেসির আর মাত্র ৫টি গোল চাই।
কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল এবং ফাইনাল মিলিয়ে আর্জেন্টিনার সামনে এখনো সম্ভাব্য ৩টি ম্যাচ বাকি রয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী মেসি যেভাবে খেলছেন, তাতে টুর্নামেন্ট শেষ হওয়ার আগে ফন্টেইনের রেকর্ড ভেঙে চুরমার হয়ে গেলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না!
বিশ্বকাপের সামগ্রিক ইতিহাসে মেসির ধারে কাছে এখন কেউ নেই। নিজের খেলা ৬টি বিশ্বকাপ মিলিয়ে তিনি ৩১টি ম্যাচ খেলেছেন (ইতিহাসে সর্বোচ্চ) এবং গোল করেছেন ২১টি (ইতিহাসে সর্বকালের সর্বোচ্চ)। তবে মেসির এই রাজত্বে বড় হুমকি হয়ে উঠছেন ফরাসি গতিদানব কিলিয়ান এমবাপ্পে।
মাত্র ২৭ বছর বয়সেই ৩টি বিশ্বকাপ খেলে ১৯ ম্যাচে ১৯টি গোল করে ফেলেছেন এমবাপ্পে। মেসিকে সিংহাসনচ্যুত করার সব রসদ এমবাপ্পের ঝুলিতে মজুত রয়েছে।
তবে রেকর্ড বইয়ের পাতা ওলটপালট করার এক অবিশ্বাস্য নেশা চেপেছে মেসির মাথায়। মিশরের বিপক্ষে গোল করার সাথে সাথেই বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে টানা ৯টি ম্যাচে গোল করার এক অনন্য নজির স্থাপন করেছেন এই মহাতারকা।
চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপের নক-আউট পর্বে অস্ট্রেলিয়া, নেদারল্যান্ডস, ক্রোয়েশিয়া ও ফ্রান্সের বিপক্ষে জাল কাঁপানোর পর, এই আসরে আলজেরিয়া, অস্ট্রিয়া, জর্ডান, কেপ ভার্দে ও মিশর—টানা ৯ ম্যাচে গোল করে মেসি বুঝিয়ে দিলেন, বয়সটা কেবলই একটা সংখ্যা মাত্র। রেকর্ড তিনি নিজের জন্য না খেললেও, রেকর্ড যে তাকে ভালোবেসে তার পায়ের কাছেই এসে ধরা দেয়, এটাই তার অকাট্য প্রমাণ!