বিশ্বকাপ মানেই শুধু ফুটবলারদের লড়াই নয়, এটি একটি দেশের জাতীয় আত্মপরিচয়, মনন এবং ফুটবল সংস্কৃতির চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ। আর এই কারণেই বড় বড় ফুটবল পরাশক্তিগুলো সবসময় বিদেশি কোচের অধীনে খেলতে তীব্র অনীহা দেখিয়ে এসেছে।
কিন্তু এই উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপে সেই পুরোনো ‘ট্যাবু’ বা নিষেধাজ্ঞা যেন এক বড়সড় ধাক্কা খেল! সব রক্ষণশীল চিন্তাভাবনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে থমাস টুখেলের ইংল্যান্ড এবং রুডি গার্সিয়ার বেলজিয়াম যখন কোয়ার্টার ফাইনালে পা রেখেছে, তখন ফুটবল বিশ্ব এক নতুন ইতিহাস গড়ার অপেক্ষায়।
এবারের টুর্নামেন্ট যখন শুরু হয়েছিল, তখন রেকর্ড ২৭টি দেশের ডাগআউটে ছিলেন বিদেশি কোচ, যা চার বছর আগের আসরে ছিল মাত্র ৯ জন! তবে নক-আউটের কঠিন পরীক্ষা শেষে এখন শুধু জার্মানির টুখেল এবং ফ্রান্সের গার্সিয়াই টিকে আছেন প্রথম বিদেশি কোচ হিসেবে বিশ্বকাপ উঁচিয়ে ধরার রেসে।
এর আগে সর্বশেষ ১৯৭৮ সালে অস্ট্রিয়ান কোচ আর্নস্ট হ্যাপেলের অধীনে নেদারল্যান্ডস ফাইনালে উঠলেও আর্জেন্টিনার কাছে হেরে স্বপ্নভঙ্গ হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ৪ দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো বিদেশি কোচ তার দলকে ফাইনালের মঞ্চে তুলতে পারেননি।
ফুটবলের সবচেয়ে বড় রোমান্টিক দেশ ব্রাজিলও এবার তাদের ফুটবল সংস্কৃতির খোলস ছেড়ে ইতালিয়ান মাস্টারমাইন্ড কার্লো আনচেলত্তিকে গুরু দায়িত্ব দিয়েছিল।
পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা ২০০২ সালের পর থেকে ফাইনালের মুখ দেখেনি। তবে আনচেলত্তির অধীনে সাম্বা ম্যাজিক দেখানোর এই বিশাল ও সাহসী জুয়া এখনই আলোর মুখ দেখেনি; শেষ ষোলোর ম্যাচে নরওয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে বিদায় নিয়েছে তারা।
ব্রাজিলিয়ানরা ব্যাপক সমালোচনা করলেও সিবিএফ এখনই আনচেলত্তিকে তাড়োচ্ছে না, বরং স্থায়িত্বের স্বার্থে আগামী বিশ্বকাপ পর্যন্ত তার চুক্তি আগেই নবায়ন করে রেখেছে।
অন্যদিকে, ইংল্যান্ড কিন্তু এর আগে সভেন-গোরান এরিকসন বা ফাবিও কাপেলোর মতো বিদেশি কোচ এনে তেতো অভিজ্ঞতা পেয়েছিল। তবে এবার গ্যারেথ সাউথগেটের গড়ে যাওয়া শক্তিশালী ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে থমাস টুখেল থ্রি-লায়ন্সদের ঠিকই ট্রফির দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন। কঙ্গো এবং মেক্সিকোর বাধা পেরিয়ে টুখেলের ইংল্যান্ড এখন শেষ আটে মুখোমুখি হচ্ছে ব্রাজিল-বধকারী নরওয়ের।
বেলজিয়াম অবশ্য বিদেশি কোচের রসে সবসময়ই সিক্ত। স্পেনের রবার্তো মার্তিনেস ২০১৮ সালে তাদের তৃতীয় করেছিলেন। সেই মার্তিনেস এবার পর্তুগালের ডাগআউটে বসে স্পেনের কাছে হেরে বিদায় নিলেও বেলজিয়াম কিন্তু ফরাসি রুডি গার্সিয়ার অধীনে উড়ছে। সহ-আয়োজক যুক্তরাষ্ট্রকে ৪-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে এখন তারা ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেনের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে।
ফুটবল গবেষক ও বিখ্যাত লেখক সাইমন কুপারের মতে, বড় দেশগুলোর বিদেশি কোচ না নেওয়ার পেছনে মূল কারণ ছিল ‘জাতীয় অহংকার’।
তিনি বলেন, বিশ্বকাপে দেশগুলো শুধু জিততে আসে না, তারা তাদের নিজস্ব ফুটবলীয় দর্শন প্রদর্শন করতে চায়। নিজ দেশের শীর্ষ কোচদের বাদ দিয়ে একজন বিদেশিকে এই সর্বোচ্চ আসনে বসানোকে অনেকে নিজেদের ফুটবল প্রতিভার প্রতি অপমান এবং এক ধরণের 'প্রতারণা' বলে মনে করতেন।
কিন্তু আধুনিক বিশ্বায়নের যুগে ফুটবলের সেই ভৌগোলিক সীমানা বা ট্যাকটিক্যাল বর্ডার এখন মুছে গেছে। এখন সব দেশই এক আন্তর্জাতিক ঘরানায় খেলছে, যেখানে গতি, শারীরিক শক্তি, দ্রুত পজিশন পরিবর্তন এবং নিখুঁত দলগত পরিকল্পনাই শেষ কথা।
কুপার আরও যোগ করেন, "ব্রজিল বা ইংল্যান্ড যখন বিদেশি কোচের দিকে হাত বাড়ায়, তখন বুঝতে হবে তারা মেনে নিয়েছে যে তাদের ঐতিহ্যবাহী খেলার ধরন আধুনিক ফুটবলে আর কাজ করছে না। এটা একটা দেশের ফুটবলের 'আত্মা' বিক্রি করে দেওয়ার মতো কঠিন সিদ্ধান্ত। কিন্তু যখন বছরের পর বছর ব্যর্থতা গ্রাস করে, তখন এমন সংকটময় মুহূর্তে মানুষ দেশপ্রেম ভুলে বিদেশি মগজকেও আপন করে নেয়, ইংল্যান্ড তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
এখন দেখার বিষয়, ফুটবল ইতিহাসের এই শতাব্দী প্রাচীন ট্যাবু ভেঙে টুখেল বা গার্সিয়ার হাত ধরে কোনো 'বিদেশি'র মাথায় বিশ্বজয়ের মুকুট ওঠে কিনা!