যেভাবে বিশ্ব ফুটবলের নতুন পরাশক্তি হয়ে উঠছে মরক্কো

‘বিশ্ব ফুটবলের পরবর্তী পরাশক্তি বা পাওয়ারহাউস হওয়ার সবটুকু সম্ভাবনা আছে মরক্কোর’- কথাটি কোনো মরক্কান নাগরিকের আবেগতাড়িত উক্তি নয়, বরং দেশটির ফুটবলের ভেতরের কর্মযজ্ঞ সচক্ষে দেখা ওয়েলসম্যান নীল ওয়ার্ডের এক সাহসী ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়ন।

২০২০ সালে ওয়েলস ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান নির্বাহীর পদ ছেড়ে মরক্কো ফুটবল ফেডারেশনের টেকনিক্যাল অপারেশন্সের ডিরেক্টর হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ২০২২ সালে মরক্কো যখন প্রথম আফ্রিকান দেশ হিসেবে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে ওঠে, নীল ওয়ার্ড তখন রাজধানী রাবাতে। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে পুরো শহর মাঝরাত থেকে ভোর পর্যন্ত উৎসবে মেতেছিল, এমনকি স্বয়ং দেশের রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদও রাস্তায় নেমে এসেছিলেন সাধারণ মানুষের সাথে উল্লাস করতে।

Morocco Team 06
বোস্টন স্টেডিয়ামে যখন মরক্কো আবারও সেই ফ্রান্সের মুখোমুখি হতে যাচ্ছে, তখন বিশ্ব ফুটবল খুব ভালো করেই জানে, ২০৩০ বিশ্বকাপের এই সহ-স্বাগতিক দেশ কোনো ফ্লুক বা আকস্মিক চমক নয়। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত মরক্কোর যুব উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা আরেক ব্রিটিশ কোচ সাইমন জেনিংস স্পষ্ট করে বলেছেন, যা ঘটছে তা কোনো দুর্ঘটনা নয়। এটি একটি সুনির্দিষ্ট ও স্পষ্ট জাতীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষার ফসল।

এই বিশাল উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে পেছন থেকে জ্বালানি জোগাচ্ছেন স্বয়ং রাজা ষষ্ঠ মোহাম্মদ। মরক্কোর রাজপ্রাসাদ থেকে ফুটবলের পেছনে ঢালা হচ্ছে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থ। তৈরি হয়েছে অত্যাধুনিক ন্যাশনাল একাডেমি, বিশ্বমানের ট্রেনিং সেন্টার, আঞ্চলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং হাজার হাজার অপেশাদার ফুটবল মাঠ।

ইউরোপের ক্লাবগুলোতে খেলে অভ্যস্ত তারকা ফুটবলারদের ধরে রাখতে এই সুযোগ-সুবিধাই মূল ভূমিকা রাখছে। অবশ্য দেশের তরুণ আন্দোলনকারীরা এই বিপুল অর্থ শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের দাবি তোলায় রাজপ্রাসাদও বসে থাকেনি। ২০২৬ সালের বাজেটে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যে রেকর্ড ১১.২ বিলিয়ন পাউন্ড বরাদ্দ দিয়েছে তারা, যা আগের বছরের চেয়ে ১৬% বেশি।

Morocco Team 04
নীল ওয়ার্ডের মতে, মরক্কোর এই বিনিয়োগের মূল উদ্দেশ্য হলো,আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্য প্রমাণ করে ‘সফট পাওয়ার’ বা কোমল কূটনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়া।

আর এই মানসিকতার পরিবর্তন এনেছিলেন সাবেক কোচ ওয়ালিদ রেগ্রাগুই। ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপে বল মাঠে গড়ানোর আগেই তিনি খেলোয়াড়দের মগজে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন, তারা কাতারে শুধু তিনটি গ্রুপ ম্যাচ খেলতে যাচ্ছে না, তারা ইতিহাস গড়তে যাচ্ছে।

মরক্কোর এই অবিশ্বাস্য উত্থানের পেছনে সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তাদের ‘ডায়াসপোরা’ বা প্রবাসী মরক্কানদের প্রতিভা। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের হিসেব অনুযায়ী, প্রায় ৫০ লাখের বেশি মরক্কান বিদেশে বাস করেন। মরক্কো ফুটবল ফেডারেশন ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, জার্মানি ও নরওয়ের মতো দেশগুলোতে ফুল-টাইম স্কাউট নিয়োগ করে রেখেছে, যারা খুব ছোটবেলাতেই মরক্কান বংশোদ্ভূত প্রতিভাদের খুঁজে বের করে। সাইমন জেনিংস জানান, ওদেরকে দ্বিতীয় কোনো দেশের নাগরিক মনেই করা হয় না, ওরা শতভাগ মরক্কান আবেগ বুকে নিয়ে মাঠে নামে।

Morocco Team 03
ফলাফল হাতেনাতেই মিলছে, বর্তমান বিশ্বকাপ স্কোয়াডের ২৬ জনের মধ্যে ১৯ জনেরই জন্ম মরক্কোর বাইরে! এমনকি কোয়ার্টার ফাইনালের প্রতিপক্ষ ফ্রান্সের হয়ে খেলার যোগ্যতা ছিল এমন ৬ জন ফুটবলার আজ মরক্কোর জার্সিতে মাঠ কাঁপাবেন, যার মধ্যে লিলের ১৮ বছর বয়সী তারকা মিডফিল্ডার আইয়ুব বুয়াদ্দি অন্যতম। বার্সেলোনার বিস্ময় বালক লামিন ইয়ামাল যখন মাত্র ১২ বা ১৩ বছরের শিশু, তখন থেকেই তাকে দলে ভেড়াতে তার পরিবারের সাথে নিয়মিত বৈঠক করেছিল মরক্কো। ইয়ামালকে না পাওয়া গেলেও প্রতিভা অন্বেষণে মরক্কো যে কোনো খামতি রাখেনি, তা স্পষ্ট।

মরক্কোর পরবর্তী লক্ষ্য হলো নিজেদের দেশের মাটিতে প্রথিতযশা খেলোয়াড় তৈরি করা। ২০২২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত টেকনিক্যাল ডিরেক্টরের দায়িত্বে থাকা ক্রিস ভ্যান পুইভেল্ড জানান, ২০৩০ বিশ্বকাপের মধ্যে তারা দলে মরক্কোয় জন্ম নেওয়া এবং প্রবাসে বেড়ে ওঠা খেলোয়াড়দের অনুপাত ৫০-৫০ করতে চান।

Morocco Team 05
২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-২০ দল আফ্রিকান নেশনস কাপে কোয়ালিফাই করতে না পারায় তীব্র সমালোচনা সইতে হয়েছিল বেলজিয়ামে জন্ম নেওয়া মরক্কান কোচ মোহামেদ ওয়াহবিকে। কিন্তু ফেডারেশন তাঁর ওপর আস্থা হারায়নি। আর সেই ধৈর্যের ফল হিসেবেই ওয়াহবি ও তাঁর স্টাফরা ২০১৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জয়ের ঐতিহাসিক কীর্তি গড়েন! এর পরপরই রেগ্রাগুইয়ের পদত্যাগের পর ওয়াহবিকে সিনিয়র দলের কোচের দায়িত্ব দেওয়া হয় এবং ২০৩০ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তাঁর সাথে চুক্তি করা হয়।

মরক্কো শুধু নতুন স্টেডিয়ামই বানাচ্ছে না, তারা ফুটবলের একদম তৃণমূল থেকে ছাদ পর্যন্ত মজবুত কাঠামো তৈরি করছে। কাতারে মরক্কো যে সাফল্যের ‘অক্সিজেন’ পেয়েছিল, তা এখন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছে পুরো দেশে। বস্টনে ফ্রান্সের বিপক্ষে ম্যাচের ফলাফল যা-ই হোক না কেন, বিশ্ব ফুটবলের নতুন পরাশক্তি হিসেবে মরক্কোর এই অগ্রযাত্রা থামানোর সাধ্য এখন আর কারও নেই!

তথ্যসূত্র: বিবিসি