বোস্টনের কোয়ার্টার ফাইনালের মহাযুদ্ধ কেবল ফ্রান্স আর মরক্কোর ঔপনিবেশিক ইতিহাসের লড়াই নয়, এটি আসলে স্পেনের মালাগা থেকে আসা এক যুবকের নিজের পরিচয় প্রমাণ এবং রিয়াল মাদ্রিদের ড্রেসিংরুমের দুই পরম বন্ধুর একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার গল্প। রাত ২টায় মাঠের লড়াইয়ে মুখোমুখি হচ্ছেন রিয়াল মাদ্রিদের দুই বর্তমান মহাতারকা, কিলিয়ান এমবাপে এবং মরক্কোর আক্রমণভাগের নতুন প্রাণভোমরা ব্রাহিম দিয়াজ। ইতিহাস, আবেগ আর রিয়াল মাদ্রিদের অভ্যন্তরীণ রসায়নে ঠাসা এই ম্যাচটি ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এক চরম রোমাঞ্চকর প্যাকেজ হতে যাচ্ছে।
মাত্র ২৬ বছর বয়সেই মরক্কোর বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সি গায়ে চাপিয়ে রীতিমতো উড়ছেন ব্রাহিম দিয়াজ। এটি তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ হলেও, ইতিমধ্যে টুর্নামেন্টে চারটি অ্যাসিস্ট করে যে কোনো আফ্রিকান ফুটবলার হিসেবে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের ঐতিহাসিক রেকর্ড নিজের করে নিয়েছেন তিনি। মরক্কোর ‘অ্যাটলাস লায়ন্স’দের আক্রমণভাগের মূল চাবিকাঠি এখন এই মালাগার ছেলের পায়েই।
তবে এই পথটা ব্রাহিমের জন্য মোটেও সহজ ছিল না। রিয়াল মাদ্রিদের হয়ে নিয়মিত খেলার পাশাপাশি এই ২৫-২৬ মৌসুমেই মরক্কোর মাটিতে হওয়া আফ্রিকান নেশনস কাপের বিতর্কিত ফাইনালে সেই বিখ্যাত ‘পানেঙ্কা’ শটে পেনাল্টি গোল করে মরক্কোকে ট্রফি জিতিয়েছিলেন তিনি। সিএএস’এর চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা ব্রাহিমই এই মুহূর্তে রিয়াল মাদ্রিদের একমাত্র খেলোয়াড়, যার ঝুলিতে এই মরসুমে একটি অফিশিয়াল আন্তর্জাতিক ট্রফি রয়েছে!
আর ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, আজ সেই ব্রাহিমকেই লড়তে হচ্ছে তাঁর রিয়ালের সতীর্থ ও অন্যতম সেরা বন্ধু কিলিয়ান এমবাপ্পের বিরুদ্ধে। দুই বছর আগে এমবাপ্পে যখন সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে পা রাখেন, তখন ফরাসি অধিনায়ককে রিয়ালের ড্রেসিংরুমে মানিয়ে নিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিলেন এই ব্রাহিমই। তাঁদের বন্ধুত্ব এতটাই গভীর যে, রিয়ালের হয়ে গোল করার পর এমবাপে বহুবার ব্রাহিমের সেই সিগনেচার গোল উদযাপনের ভঙ্গি নকল করে উল্লাস করেছেন।
কিন্তু আজ বস্টনের মাঠে সেই দোস্তি রূপ নিতে যাচ্ছে এক চরম বৈরিতায়। বন্ধুত্বের চাদর সরিয়ে আজ ৯০ মিনিটের জন্য একে অপরের টুঁটি চেপে ধরতে প্রস্তুত এই দুই রিয়াল তারকা।
মাঠের বাইরেও মরক্কোর সাধারণ মানুষের মনে ব্রাহিমের প্রভাব এখন আকাশচুম্বী। আমেরিকায় মরক্কো দল যে হোটেলে অবস্থান করছে, সেখানে হাজার হাজার সমর্থক কেবল ব্রাহিমকে একনজর দেখার জন্য হোটেলের ব্যালকনির নিচে ভিড় জমাচ্ছেন।
ব্রাহিম ব্যালকনিতে আসতেই যে উন্মাদনা আর ইউফোরিয়া তৈরি হচ্ছে, তা মরক্কোবাসীর ২০২২ সালের সেই চতুর্থ স্থান অর্জনের রূপকথাকে ছাড়িয়ে যাওয়ার স্বপ্নকে আরও উসকে দিচ্ছে।
কাতারে হাকিমি-জিয়েশরা যা করেছিলেন, এবার ব্রাহিম দিয়াজের জাদুকরী পাস আর ক্ষিপ্র গতিতে ভর করে ফরাসিদের সাম্রাজ্য গুঁড়িয়ে দিয়ে সেমিফাইনালের টিকিট কাটতে মরিয়া মরক্কো। এমবাপ্পে কি পারবেন নিজের বন্ধুকে থামিয়ে ফ্রান্সের দাপট ধরে রাখতে, নাকি ব্রাহিমের অ্যাসিস্টের বন্যায় ভেসে যাবে ফরাসি রক্ষণভাগ? উত্তর দেবে বস্টনের সবুজ গালিচা!