ফুটবল দুনিয়ায় লাইমলাইটে থাকাটা আর্লিং হালান্ডের জন্য নতুন কিছু নয়। কিন্তু ২৫ বছর বয়সী এই গোলমেশিনকে নিয়ে উন্মাদনা এখন এমন এক চূড়ায় পৌঁছেছে, যা হয়তো তিনি নিজেও কখনো কল্পনা করেননি। আগামী শনিবার ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নরওয়ের ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ম্যাচ, বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল। আর এই মহাযুদ্ধের আগে পুরো নরওয়ে জাতির স্বপ্ন একাই কাঁধে বয়ে বেড়াচ্ছেন এই তরুণ তুর্কি। তবে চাপ নেওয়া তো দূরের কথা, এই উন্মাদনার প্রতিটি সেকেন্ড তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছেন হালান্ড!
এই পাগলামির মাত্রা কতটা, তা বোঝাতে হালান্ড নিজেই তাঁর সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি পোস্ট করে লিখেছেন, আজ একটা কাজ করুন... গুগলে আমার নাম লিখে সার্চ করুন। সত্যিই, গুগলে ‘Haaland’ লিখে সার্চ করলেই ভেসে উঠছে একটি বিশেষ ‘ইস্টার এগ’- যেখানে দেখা যাচ্ছে বিশ্বকাপে নরওয়ের রূপকথার পথচলার থিম সং হয়ে ওঠা সেই বিখ্যাত ‘ভাইকিং রো’ এবং সাথে বাজছে ড্রামের গগনবিদারী আওয়াজ! দীর্ঘ ২৮ বছর বিশ্বকাপের মঞ্চে অনুপস্থিত থাকার পর, নরওয়ের এই মহাকাব্যিক প্রত্যাবর্তন এবং শেষ ১৬-এর ম্যাচে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলকে বধ করার ঘটনা হালান্ডকে রাতারাতি ফুটবল না দেখা সাধারণ মানুষেরও নয়নমণি বানিয়ে তুলেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় এখন হালান্ডকে নিয়ে মিমের বন্যা। কোথাও এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তাকে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে ভাইকিং সেনাবাহিনীর সেনাপতি হিসেবে দেখানো হচ্ছে, তো কোথাও আবার তাকে সাজানো হয়েছে কোরিয়ান কে-পপ আইডল হিসেবে! ইন্টার মায়ামির মাঠে নরওয়ের অনুশীলন ক্যাম্পে এখন ক্যামেরা আর সাংবাদিকদের যে উপচে পড়া ভিড়, তা যেকোনো পরিসংখ্যানের চেয়েও বড় সত্য বলে দিচ্ছে। সতীর্থ মিডফিল্ডার মর্টেন থর্সবি চারপাশ তাকিয়ে বলেই ফেললেন, আমার মনে হয় এটিই এখন পর্যন্ত টুর্নার্মেন্টের সবচেয়ে বড় প্রেস কনফারেন্স!
চলমান বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ৭টি গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে মেসির সঙ্গে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে আছেন হালান্ড (শীর্ষে থাকা লিওনেল মেসির গোল ৮টি)। তবে নিজের দেশের এই অবিশ্বাস্য সাফল্যে হালান্ড নিজেই কিছুটা থতমত খেয়ে গেছেন। অকপটে স্বীকার করে তিনি বলেন, আমি মোটেও এটা আশা করিনি। সত্যি বলতে, ব্রাজিলের সাথে ম্যাচের আগেও ভাবিনি আমরা এতদূর আসব। নরওয়ের মতো দলের হয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার খেলাটা আমার নিজের জন্যও বেশ চমকপ্রদ। বিশ্বকাপে খেলতে পারাটাই আমার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় লক্ষ্য ছিল। আর আজ নিজের নরওয়েজিয়ান বন্ধুদের সাথে নিয়ে বিশ্বের সেরা দলগুলোর বিরুদ্ধে এই রাজকীয় মঞ্চে লড়তে পারছি, এটা সত্যিই স্পেশাল।
মাঠের ভেতরে হালান্ড যতটা ‘দানবীয়’, মাঠের বাইরে ততটাই মাটির মানুষ। সতীর্থ ক্রিস্টিয়ান থর্স্টভেড জানান, দলে হালান্ড কোনো অহংকারী সেলিব্রেটি নন, বরং সবার জন্য এক অনুপ্রেরণাদায়ী রোল মডেল। পেশাদারিত্ব বজায় রেখে কীভাবে ফুটবল থেকে মন সরিয়ে রিল্যাক্স করতে হয়, সেই টিপস দলের সবাই হালান্ডের কাছ থেকেই নিচ্ছেন।
ব্রাজিলকে বিদায় করার পর নরওয়েজিয়ানদের আত্মবিশ্বাস এখন আকাশচুম্বী। দেশটির সাধারণ সমর্থকরা আমেরিকার রাস্তায় রাস্তায় উৎসবের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ার থেকে শুরু করে বোস্টনের চলন্ত এসকেলেটর, সবখানেই সমর্থকরা মেতে উঠেছেন তাদের ঐতিহ্যবাহী ‘ভাইকিং রো’ উদযাপনে। বিষয়টি নিয়ে হাসিমুখে হালান্ড বলেন, নরওয়ের মানুষের জন্য এগুলো মোটেও স্বাভাবিক দৃশ্য নয়। এটা ভীষণ স্পেশাল। জীবনে একটু মজা করা, ইয়ার্কি করাটা খুবই দরকার। আমার প্রতিদিনের লাইফস্টাইলের মূল চাবিকাঠিই হলো, ভালোভাবে অনুশীলন করো, ম্যাচের জন্য সেরা প্রস্তুতি নাও এবং বাকি সময়টা প্রাণখুলে হাসো। আমরা যেহেতু বিশ্বকাপে এসেছি, আমাদের এই মুহূর্তটা উপভোগ করতেই হবে, কারণ কোনো কিছুই চিরকাল স্থায়ী হয় না।