বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার কাছে ৩-১ ব্যবধানে হেরে বিদায় নেওয়ার পর ক্ষোভে ও হতাশায় ফেটে পড়েছে সুইজারল্যান্ড শিবির। ম্যাচের ৭২তম মিনিটে স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলোর বিতর্কিত লাল কার্ড নিয়েই মূলত যত কাণ্ড!
ভিডিও রেফারি রিভিউয়ের পর রেফারি সিলভা পিনহেইরো যখন আলবিসেলেস্তে মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্রো পারেদেসের ফাউল ও হলুদ কার্ড বাতিল করে উল্টো এমবোলোকেই ‘সিমুলেশন’ বা অভিনয়ের দায়ে দ্বিতীয়বার বুকিং দিয়ে মাঠছাড়া করলেন, তখন থেকেই সুইস ডাগআউটে আগুন ধরে যায়।
ম্যাচের পর রেফারিংয়ের এই গলদ নিয়ে সুইস ম্যানেজার মুরাত ইয়াকিন তাঁর ভেতরের সবটুকু ঝাঁজ উগরে দিয়েছেন। রেফারির এই অবিশ্বাস্য কাণ্ড নিয়ে মুরাত ইয়াকিন সরাসরি তোপ দেগে বলেন:
‘একটি জঘন্য ভুলের কারণে আমাদের এভাবে শাস্তি পেতে হলো। ওই কার্ড দেওয়ার কোনো ভিত্তিই ছিল না। আমি কিছুতেই এটা মাথায় ঢোকাতে পারছি না। সেখানে পরিষ্কার কন্টাক্ট (ধাক্কা) ছিল, রেফারি এবং ভিএআর কীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাল তা আমার বোধগম্য নয়। এই সিদ্ধান্তটি স্রেফ অবিশ্বাস্য এবং আমি এর তীব্র বিরোধিতা করছি’।
ফিফা বা রেফারিরা সরাসরি আর্জেন্টিনাকে কাপ পাইয়ে দিতে পক্ষপাতিত্ব করছে কিনা, এমন গুরুতর অভিযোগ সরাসরি না করলেও, এই একটি সিদ্ধান্তই যে ম্যাচের ভাগ্য লিখে দিয়েছে তা অকপটে স্বীকার করেছেন সুইস বস। তিনি বলেন, আমি বলব না যে আর্জেন্টিনাকে সুবিধা দেওয়া হয়েছে। ম্যাচটি উন্মুক্ত ছিল, দুই দলই ভালো ফুটবল খেলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, আজ ফুটবলের জয় হয়নি। একটি ভুলের মাশুল দিতে হলো আমাদের। এখন অভিযোগ করে লাভ নেই, আর্জেন্টিনাকে অভিনন্দন জানাতেই হচ্ছে।
লাল কার্ডের আগ পর্যন্ত ম্যাচটি সম্পূর্ণ সুইসদের নিয়ন্ত্রণে ছিল দাবি করে ইয়াকিন বলেন, আমাদের গেম প্ল্যান দারুণভাবে কাজ করছিল। ম্যাচের খতিয়ান দেখলে স্পষ্ট বুঝবেন, আমরা আমাদের প্রতিপক্ষের চেয়ে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে এবং সুপিরিয়র ছিলাম। ম্যাচে সমতা ফিরিয়ে মোমেন্টাম তখন আমাদের দিকে, আমরা যখন ফ্রেশ কিছু অ্যাটাকিং প্লেয়ার নামানোর ছক কষছি, ঠিক তখনই এই ভুল সিদ্ধান্তটি আমাদের মেরুদণ্ড ভেঙে দিল।
দলের প্রধান স্ট্রাইকার এমবোলোর পাশে দাঁড়িয়ে ইয়াকিন যোগ করেন, আমাদের এভাবে পঙ্গু করে দেয়া হলো কেন, আমি জানি না। এমবোলো পুরো ম্যাচে জানপ্রাণ দিয়ে লড়েছে, প্রচুর মার খেয়েছে। অথচ কোনো কারণ ছাড়াই তাকে এমন শাস্তি দেওয়া হলো। তবে আমার ছেলেরা আজ মাঠের হিরো ছিল।
শুধু কোচই নন, সুইস ফুটবলাররাও ম্যাচ শেষে ক্ষোভের আগ্নেয়গিরি উগরে দিয়েছেন। ম্যান সিটির ডিফেন্ডার আকানজি তো রেফারিকে সরাসরি কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বলেন, যখন আপনি জানবেন ম্যাচটা আপনি অনায়াসে জিততে পারতেন, তখন এভাবে বিদায় নেওয়াটা চরম বেদনাদায়ক। যখন রেফারিও আপনার বিপক্ষে খেলতে নামে, তখন ম্যাচ বাঁচানো কঠিন। আমি সাধারণত রেফারিং নিয়ে ঘ্যানঘ্যান করি না, তবে ক্যারিয়ারে এত একপেশে ম্যাচ আমি কখনো খেলিনি, যেখানে সব সিদ্ধান্ত একটা দলের পক্ষেই গেছে! আর্জেন্টিনার প্লেয়াররা ডাইভ দিলেও একটা হলুদ কার্ড পর্যন্ত দেখানো হয়নি।
মিডফিল্ডার রেমো ফ্রয়লারও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, আমরা রক্তগরম করা ফুটবল খেলছিলাম, আর্জেন্টিনার ওপর তুমুল চাপ সৃষ্টি করেছিলাম... ঠিক ওই লাল কার্ডের আগ পর্যন্ত। এরপর পুরো ম্যাচটা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বিশ্বকাপের এত বড় একটা ম্যাচে ভিএআর কীভাবে এমন একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন হস্তক্ষেপ করে, তা আমার মাথায় আসে না।
তবে সবশেষে সবচেয়ে কড়া ও 'সসি' পাঞ্চটি মেরেছেন সুইস কাপ্তান গ্রানিট জাকা। ক্ষোভ চেপে রেখে তিনি সোজা জানিয়ে দেন, নিয়ম তো নিয়মই, ওটা আমরা বদলাতে পারব না। তবে রেফারির এই একটা মাত্র ফালতু সিদ্ধান্ত পুরো ম্যাচটাকে সেখানেই খুন করে ফেলেছে! মাঠের রেফারিং নিয়ে সুইসদের এই তুমুল হাহাকার আর ক্ষোভ আগামী সেমিফাইনালের আগে আর্জেন্টিনার ওপর বাড়তি মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করে কিনা, তা-ই এখন দেখার বিষয়।