আটলান্টায় সমর্থকদের ঢল, হাই অ্যালার্টে পুলিশ

আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে বুধবারের সেমিফাইনাল ম্যাচটি শুধু ফুটবল মাঠের কোনো সাধারণ লড়াই নয়, এটি আসলে বারুদের স্তূপে আগুন লাগার মতো এক মহাবিস্ফোরণ! ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের মেগা সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের দুই চিরশত্রু- ইংল্যান্ড এবং আর্জেন্টিনা।

মাঠের চরম শত্রুতা আর মাঠের বাইরের রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বৈরিতার কারণে এই ম্যাচকে ঘিরে পুরো আটলান্টা শহরে এক চরম যুদ্ধংদেহী পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। দাঙ্গা আর মারামারির আশঙ্কায় ইতিমধ্যেই আটলান্টার রাস্তায় ব্যাপক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, জারি করা হয়েছে সর্বোচ্চ সতর্কতা।

England-Argentina 06
বিজেতা দল টিকিট কাটবে ফাইনালে স্পেন বা ফ্রান্সের মুখোমুখি হওয়ার। কিন্তু ম্যাচটি শুরু হওয়ার আগেই গ্যালারি ও রাস্তায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। আটলান্টা পুলিশ বিভাগ জানিয়েছে, বিশ্বকাপের এই অতি-গুরুত্বপূর্ণ সেমিফাইনাল ম্যাচকে কেন্দ্র করে শহরে ব্যাপক দর্শক ও পর্যটকদের সমাগম হচ্ছে। জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো শহরজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।

বিনোদন কেন্দ্র, স্টেডিয়ামের চারপাশ এবং দর্শনার্থীদের যাতায়াতের প্রধান রাস্তাগুলোতে অতিরিক্ত পুলিশ ও বিশেষ দল মোতায়েন থাকবে। তবে, সবচেয়ে বড় চিন্তার কারণ ফিফার টিকিট পলিসি। স্টেডিয়ামের ভেতরে দুই দেশের সমর্থকদের আলাদা গ্যালারিতে বসার কোনো কঠোর নিয়ম বা বাধ্যবাধকতা না থাকায়, গ্যালারির ভেতরেই সমর্থকেরা একে অপরের ওপর চড়াও হতে পারেন বলে মনে করছে প্রশাসন।

England-Argentina 04
এই আশঙ্কার সূত্রপাত কিন্তু গত সপ্তাহান্তেই হয়ে গেছে। মায়ামিতে যখন নরওয়েকে হারিয়ে হ্যারি কেনের ইংল্যান্ড শেষ চারে পা রাখে, তখন মায়ামির রাস্তায় ইংলিশ ফ্যানদের সাথে ল্যাটিন ও আর্জেন্টাইন সমর্থকদের তুমুল হাতাহাতি ও ধস্তাধস্তি হয়।

এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা পরেই কানসাস সিটিতে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে উড়িয়ে দিয়ে শেষ চারে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়া নিশ্চিত করে আলবিসেলেস্তেরা। সেই ম্যাচ চলাকালীন পুরো সময় জুড়েই আর্জেন্টাইন সমর্থকেরা গ্যালারিতে বসে ব্রিটিশদের ধুয়ে দিয়ে গান গেয়েছেন।

মাঠের সেই উন্মাদনা ড্রেসিংরুমে গিয়ে রূপ নেয় এক ভয়ংকর রাজনৈতিক উস্কানিতে! ম্যাচ জেতার পর আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়েরা ড্রেসিংরুমে বুক চাপড়ে সমস্বরে গান ধরেন, মালভিনাসের জন্য, ডিয়েগোর জন্য, আর লিওর (মেসি) শেষ বিশ্বকাপের জন্য!

England-Argentina 07
এই গানটির পর ফুটবল দুনিয়ায় তোলপাড় শুরু হয়েছে। ‘মালভিনাস’ বলতে আর্জেন্টাইনরা মূলত ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জকে বোঝায়, যা নিয়ে ১৯৮২ সালে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল। গানে একই সাথে স্মরণ করা হয়েছে ফুটবল ঈশ্বর প্রয়াত ডিয়েগো ম্যারাডোনাকেও।

১৯৮৬ সালের সেই বিখ্যাত কোয়ার্টার ফাইনালে ম্যারাডোনার হাত দিয়ে করা সেই ‘হ্যান্ড অব গড’ গোল এবং পরবর্তী শতাব্দীসেরা গোলের ওপর ভর করে আর্জেন্টিনাই ২-১ ব্যবধানে জিতেছিল। সুইজারল্যান্ড ম্যাচ শেষে আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার রদ্রিগো ডি পল সেই পুরোনো জখমে নুন ছিটিয়ে বলেছেন, এই ম্যাচটি ডিয়েগো আর ৮৬-র সেই রূপকথার কারণে অনেক স্মৃতি ফিরিয়ে আনছে। তার ওপর আমাদের এই গানগুলো আমাদের মালভিনাসের বীরদের কথা মনে করিয়ে দেয়। তবে আমাদের মাথায় রাখতে হবে, মালভিনাস নিয়ে আলোচনা করার জায়গা অন্য কোথাও, ফুটবল মাঠ নয়।

England-Argentina 02
মায়ামিতে ম্যাচ দেখতে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩০ হাজার ইংলিশ সমর্থক জড়ো হয়েছিলেন এবং তাদের একটি বড় অংশ আটলান্টার দিকে রওনা দিয়েছেন। তবে, আমেরিকার দক্ষিণের রাজ্যগুলোতে বিপুল সংখ্যক আর্জেন্টাইন প্রবাসীর বসবাসের কারণে গ্যালারিতে সংখ্যার দিক থেকে হ্যারি কেইনরা যে বেশ কোণঠাসা থাকবেন, তা বলাই বাহুল্য। মাঠের ফুটবল বনাম ড্রেসিংরুমের রাজনৈতিক বারুদ, বুধবারে আটলান্টার মাটি কার রক্তে বা কার কান্নায় ভিজে, তার ওপর চোখ রাখছে পুরো বিশ্ব!

তথ্যসূত্র: রয়টার্স-আল জাজিরা-এএফপি