বুধবার রাতে আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যখন বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে বিশ্বকাপের সেমিফাইনালের মহারণ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, তখন মাঠের বাইরের উত্তাপ এক লাফে বহু গুণ বাড়িয়ে দিলেন ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনার ছেলে ডিয়েগো সিনাগ্ৰা।
দুই দেশের সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক ও ক্রীড়াঙ্গনের দীর্ঘদিনের বৈরিতা নিয়ে যখন সংঘাতের আশঙ্কা করা হচ্ছে, ঠিক তখনই ম্যারাডোনা-পুত্র আর্জেন্টাইন ভক্তদের উদ্দেশ্যে এক আবেগঘন ও উসকানিমূলক বার্তা দিয়েছেন। তিনি সাফ জানিয়েছেন, এই ম্যাচটি আর্জেন্টিনার জন্য কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচ নয়, বরং এই ম্যাচ খেলতে নামলে ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত লাতিন ভাইদের কথা অবধারিতভাবেই মনে পড়ে যায়।
১৯৮২ সালে দক্ষিণ আটলান্টিকের ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত অঞ্চল ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে দুই দেশের মধ্যে ৭৪ দিনের এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হয়েছিল, যেখানে আর্জেন্টিনার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শেষ হলেও ৬৪৯ জন আর্জেন্টাইনসহ ৯০০-রও বেশি সেনার প্রাণহানি ঘটে।
সেই যুদ্ধের ঠিক চার বছর পর, ১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ এবং শতাব্দীর সেরা একক গোলের ওপর ভর করে ইংল্যান্ডকে ২-১ ব্যবধানে পিষে দিয়েছিল আর্জেন্টিনা। ২০২০ সালে ম্যারাডোনা মারা গেলেও ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে এজতেকা স্টেডিয়ামের সেই অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের জন্য তিনি আজও নিজ দেশে ঈশ্বরের আসনে বসা।
৩৯ বছর বয়সী ডিয়েগো সিনাগ্ৰা (যিনি ম্যারাডোনার সেই বিখ্যাত হ্যান্ড অব গড গোলের ঠিক দুই মাস পর জন্মগ্রহণ করেছিলেন) স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মার্কা’-কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, আমার বাবা বেঁচে থাকলে এই ম্যাচটিকে কখনোই একটা সাধারণ ম্যাচ হিসেবে দেখতেন না।
তিনি আরও যোগ করেন, আমরা মুখে অনেক কথাই বলতে পারি, কিন্তু বাস্তবতা হলো এটি অন্য যে কোনো ম্যাচের চেয়ে আলাদা। সকল আর্জেন্টাইন এবং ম্যারাডোনা-ভক্তদের জন্য এটি এমন এক লড়াই, যেখানে ফকল্যান্ডের মাটিতে শহীদ হওয়া আমাদের সব ভাইদের কথা মনে ভেসে ওঠে। একই সাথে মনে পড়ে ১৯৮৬ সালে আমার বাবার সেই কীর্তি। আমার ওল্ড ম্যান সেদিন এক ঐতিহাসিক ম্যাচ জিতেছিলেন, আর তারপর থেকেই ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে কোনো কিছুই আর স্বাভাবিক বা সাধারণ নয়।
চলতি বিশ্বকাপে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা কিংবা হ্যারি কেইনের ইংল্যান্ড- কোনো দলই এখন পর্যন্ত তাদের সেরা ছন্দে পৌঁছাতে পারেনি। তাই আটলান্টার এই লড়াইটি অত্যন্ত হাড্ডাহাড্ডি হবে বলে মনে করেন সিনাগ্ৰা। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমাদের জাতীয় দলের জন্য ম্যাচটি অবশ্যই কঠিন হবে। এটা সত্যি যে ইংল্যান্ড অনেক শক্তিশালী দল, কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ওদের কিন্তু মুখোমুখি হতে হচ্ছে বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের। তাই লড়াইটা দুই দলের জন্যই সমান কঠিন হবে।
সাক্ষাৎকারে আর্জেন্টিনার বর্তমান মহানায়ক লিওনেল মেসিকে নিয়েও নিজের মুগ্ধতা প্রকাশ করেন ম্যারাডোনা-পুত্র। আটবার ব্যালন ডি’অর জয়ী মেসিকে বুকে আগলে রেখে তিনি বলেন, মেসির সাথে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার সুযোগ আমার কখনো হয়নি, তবে সব আর্জেন্টাইনের মতো ও আমার হৃদয়ে আছে। ও আরও একটি বিশ্বকাপ জয়ের যোগ্য দাবিদার। তবে একটা কথা স্পষ্ট, লিও হলো ‘মানুষদের মধ্যে সেরা’। কারণ আমার বাবার সাথে এই পৃথিবীর কারও তুলনা চলে না, তিনি ছিলেন ফুটবলের এক ‘এলিয়েন’ (ভিনগ্রহের বাসিন্দা)! তা সত্ত্বেও লিও ও তার পরিবারের প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা রয়েছে। ও আমাদের দলের অধিনায়ক। আমি ওকে খুব সম্মান করি এবং আশা করি ঈশ্বর ওকে আরও একটি ফাইনাল খেলার এবং সেটি জেতার সুযোগ করে দেবেন।
মাঠের ভেতরে মেসির লাতিন জাদু আর মাঠের বাইরে ফকল্যান্ড যুদ্ধের আবেগ ও ম্যারাডোনার জার্সির ভূত, সব মিলিয়ে বুধবারে আটলান্টার ফুটবল যুদ্ধ যে এক রণক্ষেত্রে রূপ নিতে যাচ্ছে, তা বলাই বাহুল্য!