রাত ১টায় আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যখন আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের মধ্যে বিশ্বকাপের মেগা সেমিফাইনালের মহারণ জমে উঠতে যাচ্ছে, তখন মাঠের বাইরের মাইন্ড গেম আর টক-মিষ্টি আলোচনা গ্যালারির পারদকে একেবারে তুঙ্গে তুলে দিয়েছে।
আর এই মহাযুদ্ধের ঠিক আগ মুহূর্তে ইংলিশ ডেরার মাস্টারমাইন্ড থমাস টুখেল বোমা ফাটিয়ে জানিয়েছেন, ফুটবলের জাদুকর লিওনেল মেসিকে বোতলবন্দী করতে একদম ‘পুরনো আমলের ম্যান-মার্কিং’ (ছায়ার মতো লেগে থাকা) ট্যাকটিকস ব্যবহারের কথা ভাবছেন তিনি!
চলতি বিশ্বকাপে কিলিয়ান এমবাপ্পের সাথে যৌথভাবে সর্বোচ্চ ৮ গোল করে গোল্ডেন বুটের দৌড়ে সবার ওপরে আছেন ৩৯ বছর বয়সী মেসি। আর ক্যারিয়ারের গোধূলি লগ্নে এসে এই প্রথমবার তিনি মুখোমুখি হচ্ছেন থ্রি-লায়ন্সদের। মেসি নিজেও এই ম্যাচটির জন্য অধীর অপেক্ষায় আছেন।
মঙ্গলবার ম্যাচ পূর্ববর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে টুখেল বেশ রসিয়ে রসিয়েই তাঁর পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি বলেন, আমি সত্যিই এটা নিয়ে ভাবছি, মেসিকে আটকাতে পুরনো আমলের সেই খাঁটি ‘ম্যান-মার্কিং’ চাল চালব কি না। আইডিয়াটা শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন করব কি না নিশ্চিত নই, তবে এটা আমার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। ও মাঠে কখন কোন স্পেসে হাজির হবে, সেটা সবাই জানে। কিন্তু ও আসলে মাঠের অন্য সবার চেয়ে অনেক আগেই সব কিছু দেখতে ও বুঝতে পারে। বলটা ওর পায়ে যায়, ও ঠিক ফাঁকফোকর খুঁজে নেয়, বাঁ পায়ের জন্য জায়গা বানায় আর একদম নিখুঁতভাবে ফিনিশ করে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২১ গোল করে ইতিমধ্যে সর্বকালের সেরা গোলদাতার আসনে বসা মেসিকে নিয়ে টুখেল আরও যোগ করেন, আমরা আর্জেন্টিনার খেলার কিছু ধরন বা প্যাটার্ন লক করার চেষ্টা করেছি ঠিকই, কিন্তু মেসি এমন এক সুপারম্যান যে ওই রাস্তা বন্ধ করলে ও নিজেই নতুন রাস্তা বানিয়ে নেবে! বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন, তার ওপর লিওনেল মেসি আর ইংল্যান্ড বনাম আর্জেন্টিনা, সব মিলিয়ে এটি সব বিভাগেই একটি অতিমানবীয় ম্যাচ হতে যাচ্ছে।
আর্জেন্টিনা বধের এই মিশনে হাত ভেঙে যাওয়া জর্ডান হেন্ডারসন এবং লাল কার্ডের নিষেধাজ্ঞায় থাকা জ্যারেল কুয়ানসা ছাড়া ইংল্যান্ড দলের বাকি সবাই পুরোপুরি ফিট। তবে দুই দেশের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক ও মাঠের বৈরিতাকে বাড়তি ‘জ্বালানি’ হিসেবে ব্যবহার করতে রাজি নন এই জার্মান বস। তিনি সোজা বলেন, আমরা এই শত্রুতার ইতিহাসকে খড়কুটো বানিয়ে আগুনে ঘি দিতে চাই না। আমরা জানি আমরা কেন এখানে এসেছি। আমরা সেমিতে আছি এবং ফাইনালে যেতে আমরা প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত। আমরা প্রতিপক্ষকে সম্মান করি, তবে ইতিহাস ঘেঁটে ম্যাচটাকে অহেতুক যুদ্ধের রূপ দেয়ার কোনো মানে হয় না। এটা শুধুই একটা ফুটবল ম্যাচ।
সেমিফাইনালে আসার পথে কঙ্গো, মেক্সিকো এবং নরওয়ের বিরুদ্ধে লাল কার্ড, ভিএআর (VAR) নাটক আর অতিরিক্ত সময়ের রুদ্ধশ্বাস রোলার কোস্টার অভিজ্ঞতা পার করতে হয়েছে ইংল্যান্ডকে। এই ক্লান্তি ও স্নায়ুর চাপ কীভাবে সামলান, তা নিয়ে এক মজার তথ্য দেন ৫০ বছর বয়সী টুখেল।
একগাল হেসে ইংলিশ বস বলেন, টানা নকআউট ম্যাচগুলো সত্যিই স্নায়ুচাপের। তার ওপর গরম, উচ্চতা আর ক্লান্তি তো আছেই। তবে এই চাপই আমাকে বাঁচিয়ে রাখে, আমাকে শক্তি দেয়। আর যখন খুব বেশি চাপ হয়ে যায়, তখন সব ভুলে সাইকেল নিয়ে কোনো একটা বড় পার্কিং লটে চলে যাই। হাতে একটা আইসক্রিম নিয়ে ১৫ মিনিট কাটিয়ে দিলেই আমার নিজেকে ৫০ বছর নয়, বরং ১৫ বছরের এক কিশোর মনে হয়! এই গ্রীষ্মের ওমে ভরা রাতে একটুখানি আইসক্রিমের কামড়ই ভেতরের সুন্দর অনুভূতিটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট।
আইসক্রিম মুখে টুখেল যতই নির্ভার থাকার ভান করুন না কেন, বুধবার রাতে আটলান্টার সবুজ গালিচায় মেসির আর্জেন্টিনা বনাম টুখেলের ইংল্যান্ডের মধ্যকার এই সাউসি (রসালো) লড়াই যে ফুটবলপ্রেমীদের নখ কামড়ানো উত্তেজনার চরম স্বাদ দিতে যাচ্ছে, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না! এই অগ্নিপরীক্ষায় যে জিতবে, আগামী রবিবার নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বজয়ের ফাইনাল মঞ্চে তার জন্যই অপেক্ষা করে আছে স্পেন।
তথ্যসূত্র: ইএসপিএন