রাতে মেগা সেমিফাইনালের আগে ফুটবল দুনিয়া কাঁপছে আর্জেন্টিনা আর ইংল্যান্ডের মধ্যকার ঐতিহাসিক যুদ্ধংদেহী মনোভাব নিয়ে। মাঠের লড়াই তো আছেই, কিন্তু এই দুই দেশের ফুটবল ম্যাচ মানেই তো একরাশ ঘৃণা, বিতর্ক, প্রতিশোধ আর নাটকের মহাকাব্য। ১৯৫১ সালে ওয়েম্বলিতে যে দ্বৈরথের শুরু হয়েছিল, তা আজ রূপ নিয়েছে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রসালো এবং তিক্ততম এক লড়াইয়ে। ফাইনালের টিকিট পাওয়ার লড়াইয়ের আগে চলুন দেখে নেয়া যাক দুই চিরশত্রুর সেই হাড়কাঁপানো এবং বিতর্কিত ইতিহাস।
‘জন্তু’ গালি ও লাল-হলুদ কার্ডের জন্ম: ১৯৬২-র বিশ্বকাপে চিলির মাটিতে প্রথম সাক্ষাৎকারের পর, ১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ডের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপ কোয়ার্টার ফাইনালে দুই দলের লড়াই রূপ নেয় প্রকাশ্য যুদ্ধে। ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে হারিয়ে সেমিফাইনালে যায় ইংল্যান্ড। তবে ম্যাচ শেষে ইংলিশ কোচ স্যার আলফ রামসে ক্ষিপ্ত হয়ে আর্জেন্টাইন খেলোয়াড়দের ‘জন্তু’ বলে গালি দেন এবং নিজের শিষ্যদের তাদের সাথে জার্সি বদল করতে নিষেধ করেন।
অন্যদিকে, ম্যাচের ৩৩ মিনিটে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিতভাবে মাঠ থেকে বের করে দেয়া হয়। রাতিন মাঠ ছাড়তে অস্বীকৃতি জানালে খেলায় চরম বিশৃঙ্খলা তৈরি হয় এবং তাঁকে শেষ পর্যন্ত পুলিশ প্রহরায় মাঠের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়। এই নাটকীয় ঘটনার কারণেই পরবর্তীতে ফুটবল বিশ্বকাপে হলুদ ও লাল কার্ডের নিয়ম চালু করা হয়! আর্জেন্টাইন মিডিয়া একে ‘শতাব্দীর সেরা চুরি’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
দাঁত উপড়ে নেয়া এবং ম্যারাডোনার প্রথম হুঙ্কার: ১৯৭৭ সালের এক প্রীতি ম্যাচে মারামারির এক পর্যায়ে আর্জেন্টিনার ড্যানিয়েল বার্টোনির ঘুষিতে ইংল্যান্ডের ট্রেভর চেরির সামনের দুটি দাঁত উপড়ে পড়ে যায়! এরপর ১৯৮০ সালে ওয়েম্বলিতে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলতে নামেন ১৯ বছর বয়সী এক জাদুকর, ডিয়েগো আরমান্ডো ম্যারাডোনা। যদিও সেই ম্যাচটি ইংল্যান্ড ৩-১ ব্যবধানে জিতেছিল।
‘ঈশ্বরের হাত’ ও শতাব্দীর সেরা গোল: ফকল্যান্ড যুদ্ধের চার বছর পর, ১৯৮৬ মেক্সিকো বিশ্বকাপের শেষ আটে মুখোমুখি হয় দুই দল। এই ম্যাচটিই দুই দেশের বৈরিতাকে চিরস্থায়ী রূপ দেয়। ম্যারাডোনা লাফিয়ে উঠে ইংলিশ গোলরক্ষক পিটার শিলটনকে বোকা বানিয়ে হাত দিয়ে বল জালে জড়ান, যা পরে বিখ্যাত হয় ‘হ্যান্ড অব গড’ (ঈশ্বরের হাত) নামে। এই ক্ষোভ মেটানোর সুযোগও দেয়নি ইংল্যান্ডকে; ঠিক চার মিনিট পর মাঝমাঠ থেকে একাই ছয় ইংলিশ ডিফেন্ডারকে ড্রিবলিংয়ে নাচিয়ে ম্যারাডোনা করেন ‘শতাব্দীর সেরা গোল’। ম্যাচটি আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে জিতে যায় এবং ইংলিশদের বুকে এঁকে দেয় চিরকালের ক্ষত।
সিমেওনের অভিনয়, বেকহ্যামের ‘খলনায়ক’ বনে যাওয়া: ১৯৯৮ সালের ফ্রান্স বিশ্বকাপের শেষ ১৬-র লড়াইয়ে ফুটবল বিশ্ব দেখেছিল আরেক অবিশ্বাস্য নাটক। ১৮ বছর বয়সী মাইকেল ওয়েনের জাদুকরী গোল সত্ত্বেও ম্যাচের মূল আকর্ষণ হয়ে দাঁড়ায় ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ড।
আর্জেন্টিনার দিয়েগো সিমেওনে ফাউল করার পর মাটিতে শুয়েই পা দিয়ে আলতো করে লাথি মেরে বসেন তরুণ বেকহ্যামকে। সিমেওনের অতিরঞ্জিত অভিনয়ের কাছে বোকা বনে রেফারি বেকহ্যামকে লাল কার্ড দেখান। ১০ জনের ইংল্যান্ড পরে টাইব্রেকারে হেরে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয়, আর রাতারাতি খলনায়কে পরিণত হওয়া বেকহ্যাম দেশে ফিরে শিকার হন চরম লাঞ্ছনার।
বেকহ্যামের রাজকীয় প্রতিশোধ ও শেষ রোমাঞ্চ: ২০০২ বিশ্বকাপে এলো বেকহ্যামের রাজকীয় প্রায়শ্চিত্ত ও প্রতিশোধের পালা। ম্যাচের আগে সিমেওনের সাথে করমর্দন করে মাঠের খেলায় পেনাল্টি থেকে গোল করে ইংল্যান্ডকে ১-০ ব্যবধানে জেতান অধিনায়ক বেকহ্যাম। সেই জয়ে আর্জেন্টিনা গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়। ম্যাচ শেষে পল স্কোলস বলেছিলেন, জার্মানিকে ৫-১ গোলে হারানোর চেয়েও এটি ১০ গুণ বেশি তৃপ্তির!
সবশেষ ২০০৫ সালে জেনেভায় এক প্রীতি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল দুই দল। প্রীতি ম্যাচ হলেও সেটি ছিল উত্তেজনায় ঠাসা; শেষ মুহূর্তে মাইকেল ওয়েনের জোড়া গোলে ৩-২ ব্যবধানে রোমাঞ্চকর জয় পায় ইংল্যান্ড। দীর্ঘ ২১ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চে আবার মুখোমুখি এই দুই দল।
ইতিহাস বলছে, ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াইয়ে ফুটবল কখনো কেবল ‘একটা খেলা’ হয়ে থাকে না। বুধবারের এই সেমিফাইনালের মঞ্চে নতুন কোনো নাটক, নাকি পুরনো কোনো ক্ষতের প্রতিশোধ নেওয়া হবে, সেদিকেই এখন চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে কোটি ফুটবল ভক্ত!