ফুটবলের বিশ্বমঞ্চে গুরু-শিষ্যের মহাকাব্যিক পুনর্মিলন

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে যখন ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেন ও আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হবে, তখন ডাগআউটের লড়াইটা রূপ নেবে এক ক্ল্যাসিক গুরু-শিষ্যের দ্বৈরথে! স্পেনের লুইস দে লা ফুয়েন্তে এবং আর্জেন্টিনার লিওনেল স্কালোনি, দুজনের ফাইনালে আসার গল্পটা দুই ভিন্ন মেরুর হলেও, তাদের হৃদয়ের সুতো বাঁধা আছে এক অদ্ভুত ও গভীর বন্ধনে।

পেছনে ফিরে তাকালে দেখা যাবে ২০১৭ সালটি ছিল স্কালোনির খেলোয়াড়ি জীবন-পরবর্তী এক শূন্যতার সময়। ফুটবল ছাড়ার পর কী করবেন, তা যখন ভেবে পাচ্ছিলেন না, তখন উয়েফা প্রো লাইসেন্স কোর্সের জন্য স্প্যানিশ ফেডারেশনে ভর্তি হন তিনি।

আর সেখানেই শিক্ষক হিসেবে তাঁর সামনে হাজির হন দে লা ফুয়েন্তে, যিনি তখন কোর্সের টেকনিক্যাল মডিউল পড়ানোর পাশাপাশি স্পেনের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের দায়িত্বে ছিলেন। ছাত্র স্কালোনি সেই ব্যাচে অন্যতম সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে পাস করেন এবং পরে কৃতজ্ঞচিত্তে স্বীকার করেন যে, শিক্ষক দে লা ফুয়েন্তে তাঁদের দুহাত বাড়িয়ে সাহায্য করেছিলেন।

Lionel Scaloni 03
আজ সেই শিক্ষকের ট্রফি ছিনিয়ে নিতেই রণকৌশল সাজাচ্ছেন তাঁর সেরা ছাত্র! মজার ব্যাপার হলো, এই দুই কোচের কেউই এর আগে শীর্ষস্তরের কোনো ক্লাবের কোচের চেয়ারে বসেননি। অথচ আজ দে লা ফুয়েন্তে একই সাথে ইউরো ও বিশ্বকাপ জিতে ইতিহাসের পাতায় অমর হওয়ার অপেক্ষায়, আর স্কালোনি দাঁড়িয়ে আছেন টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বজয়ের রাজকীয় সিংহাসনের সামনে। ফুটবল জগৎ যাদের একসময় প্রায় ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল, সেই দুই মানুষের জন্য এই অর্জন রূপকথাকেও হার মানায়!

একটি ফোন কল আর ফুয়েন্তের পুনর্জন্ম: স্পেনের রিং-মাস্টার ফুয়েন্তের ফুটবলের মূলমন্ত্র গড়ে উঠেছে ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ধর্মীয় মূল্যবোধের মতো অনুশাসনের ওপর। অথচ ২০১১ সালে দেপোর্তিভো আলাভেস থেকে বরখাস্ত হওয়ার পর দীর্ঘ ১৮ মাস তিনি বেকার ছিলেন এবং ফুটবল থেকে প্রায় হারিয়েই যাচ্ছিলেন। ঠিক তখনই পত্রিকায় স্প্যানিশ ফেডারেশনের একটি যুব কোচের বিজ্ঞাপন দেখে ভাগ্য পরীক্ষা করতে ফোন করেন তিনি। মাত্র তিন মাসের সেই চুক্তিই আজ তাঁর ভাগ্য বদলে দিয়েছে। অনূর্ধ্ব-১৯, অনূর্ধ্ব-২১ এবং অলিম্পিক দল পার করে ২০২২ সালে যখন তিনি মূল জাতীয় দলের দায়িত্ব নেন, তখন এই স্কোয়াডের দানি অলমো, পেদ্রি, কুকারেল্লাদের তিনি চেনেন এক দশক ধরে।

Lionel Scaloni 02
ফুটবলীয় ট্যাকটিক্সের চেয়েও ফুয়েন্তের কাছে ‘পরিবার’ সবার ওপরে। ইউরো ২০২৪ আসরে ফাইনালের ঠিক আধ ঘণ্টা আগে গ্যালারিতে নিজের পরিবার ঠিকঠাক পৌঁছেছে কি না, তা জানতে ফোনে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। এই বিশ্বকাপেরই এক ম্যাচের মাঝে যখন জানতে পারেন দলের ফটোগ্রাফারের মা মারা গেছেন, তখন মাঝমাঠেই পুরো দলকে নিয়ে তাঁকে জড়িয়ে ধরেন এই ৬৫ বছর বয়সী কোচ। সেমির আগে নিজের পরলোকগত ভাইকে নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সংবাদ সম্মেলনেই কেঁদে ফেলেছিলেন তিনি। এই স্প্যানিশ দলে তাঁর ছেলে আলবার্তোও সহকারী স্টাফ হিসেবে কাজ করছেন।

বার্বিকিউ, কারাওকে আর স্কালোনির আর্জেন্টাইন দাওয়াই: শিক্ষক ফুয়েন্তে যেখানে ফেডারেশনের ক্লাস রুমে ফুটবল শিখেছেন, ছাত্র স্কালোনির শিক্ষাটা সেখানে সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমের নিজস্ব অলিখিত নিয়ম ও সিনিয়র খেলোয়াড়দের কর্তৃত্বের সংস্কৃতিতে বড় হয়েছেন তিনি। ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ায় অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপজয়ী স্কালোনি ট্রফির পাশাপাশি উপহার পেয়েছিলেন এক ‘বিমান আতঙ্ক’! দেপোর্তিভো লা করুনার হয়ে খেলার সময় বিমান দুর্ঘটনার ভয়ে তিনি দলের সাথে ফ্লাইটে যেতেন ঠিকই, কিন্তু ফেরার সময় বাবার সাথে গাড়িতে ৬০০ থেকে ১০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি ফিরতেন।

২০১৫ সালে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর তীব্র মানসিক অবসাদে ভুগেছেন স্কালোনি। সেই ‘খালি সকালগুলোর’ একঘেয়েমি কাটাতে বাড়ির কাছের এক ক্লাবে ১৪ বছরের বাচ্চাদের কোচিং করানো শুরু করেন, যা তাঁকে নতুন জীবন দেয়। পরে হোর্হে সাম্পাওলির সহকারী হয়ে সেভিয়া ও পরবর্তীতে আর্জেন্টিনা দলে আসেন এবং ২০১৮ বিশ্বকাপের ভরাডুবির পর চরম সমালোচনার মুখে আর্জেন্টিনার হেড কোচ হন।

Two Coach of Final 1
স্কালোনির জাদু কোনো রকেট সায়েন্স বা গাণিতিক ছক নয়; তাঁর মূল শক্তি হলো ড্রেসিংরুমের পরিবেশ। বার্বিকিউ পার্টি, কারাওকে নাইট আর মহাতারকাদের সাথে সাধারণ মুহূর্তের মেলবন্ধন ঘটিয়ে তিনি দলকে একটি পরিবার বানিয়েছেন। বিশ্বকাপ ও কোপা জয়ের পর অ্যাড্রেনালিনের চাপ আর বাবা-মায়ের অসুস্থতা সামলাতে স্বয়ং স্কালোনিকেও সাইকোলজিস্টের শরণাপন্ন হতে হয়েছিল, করতে হয়েছিল দীর্ঘ সাইকেল রাইডিং।

পদ্ধতি এক, লক্ষ্য এক: দুই কোচের দর্শন কিন্তু একই, ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের চেয়ে দলগত ঐক্য বড়। দে লা ফুয়েন্তে যেমন নিজের চেনা তরুণদের ওপর ভরসা রেখেছেন, স্কালোনিও ২০১৯ কোপা সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে হেরে যাওয়ার পরও মেসির সহযোগীদের ওপর আস্থা হারাননি, যার ফল মারাকানায় কোপা জয়। এমনকি দেশের মানুষকে আনন্দ দেওয়ার অনুভূতির প্রশ্নেও দুজনের সুর এক।

রোববার যখন শিক্ষক ও ছাত্রের এই ঐতিহাসিক পুনর্মিলন ঘটবে, তখন হার-জিতের ঊর্ধ্বে গিয়ে ফুটবল বিশ্ব কুর্নিশ জানাবে এই দুই ব্রাত্য ফুটবল মায়োস্ত্রোকে, যারা খেলাটির মূল বইয়ে নিজেদের নাম সোনা দিয়ে লিখে নিয়েছেন!

তথ্যসূত্র: বিবিসি