১০ জনের আর্জেন্টিনার প্রতিরোধ গুঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের সোনালী ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর স্প্যানিশ মাস্টার মাইন্ড লুইস দে লা ফুয়েন্তে গর্জে উঠে বললেন, ভাগ্যের সাথে আমাদের আজ অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেখা ছিলো, আর আমরা সেটা ছিনিয়ে নিয়েছি! অতিরিক্ত সময়ের চরম উত্তেজনাকর লড়াইয়ে বিকল্প ফরোয়ার্ড ফেরান তোরেসের ১০৬ মিনিটের সেই রূপকথা সমতুল্য গোলে আর্জেন্টিনা বধ নিশ্চিত করে ইউরোপসেরা স্পেন। ২০১০ সালে সাউথ আফ্রিকার মাটিতে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার সেই ঐতিহাসিক অতিরিক্ত সময়ের গোলের কথা মনে করিয়ে দিয়ে ফেরান তোরেস এখন পুরো স্পেনের নয়নমণি।
তবে ফুটবলের চেয়েও ম্যাচের মাঠ ও মাঠের বাইরের নাটকীয়তা আর বিতর্কের ঝালই যেন মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বেশি ছড়িয়েছে!
খেলার ৯৩ মিনিটে পাউ কুবার্সিকে দায়িত্বজ্ঞানহীন ফাউল করে এনজো ফার্নান্দেজ মাঠ ছাড়ার পর ১০ জনের আর্জেন্টিনা পুরো ম্যাচে খড়কুটোর মতো ভেসে যায়। কিন্তু ম্যাচের আসল রূপনাটক তখনও বাকি ছিল! রেফারির শেষ বাঁশি বাজতেই মাঠে ছড়ায় তুমুল হাতাহাতি। স্প্যানিশ তারকা এরিক গার্সিয়াকে ধাক্কা দেয়া এবং মাটিতে পড়ে থাকা গাভিকে ঘুষি মারার অভিযোগে আর্জেন্টাইন মিডফিল্ডার লেয়ান্দ্রো পারদেসকেও সরাসরি লাল কার্ড দেখান স্লোভেনিয়ার রেফারি।
বিতর্কের এখানেই শেষ নয়! পুরস্কার প্রদান মঞ্চে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রির হাতে ‘গোল্ডেন বল’ ও বিশ্বজয়ের অফিশিয়াল ট্রফি তুলে দিচ্ছিলেন, তখন চরম ক্ষোভে ব্যাকস্টেজ ও গ্যালারির দিকে পিঠ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পুরো আর্জেন্টিনা দল! পরাজয়ের তেতো স্বাদ আর আসরজুড়ে রেফারিং নিয়ে তাদের এই অনাস্থা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় এক চরম অনভিপ্রেত বিতর্কে।
২০২২ সালে কাতার জয়ী মাস্টারমাইন্ড লিওনেল স্কালোনি ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে এসে চোখের জল ধরে রাখতে পারেননি। গলার স্বর জড়িয়ে আসা কণ্ঠে আবেগঘন স্কালোনি বলেন, আমার আত্মা আজ কেঁদে উঠেছে, আমি সত্যিই ক্ষমাপ্রার্থী। আমাকে সততার সাথে বলতে হবে, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে আমার কিছুদিন সময় দরকার। আমি নিশ্চিত নই যে, এমন একটি লড়াকু ফুটবল পরিবার আবার গড়ে তোলা সম্ভব কি না। এই বছরের শেষে চুক্তি শেষ হতে যাওয়া স্কালোনির এই মন্তব্য ইঙ্গিত দিচ্ছে, বিশ্বজয়ী এই কোচের অধ্যায় হয়তো এখানেই ইতি টানতে চলেছে।
৩৯ বছর বয়সী লিওনেল মেসির আন্তর্জাতিক অবসর নিয়েও প্রশ্ন উঠলে স্কালোনি আবেগ চেপে বলেন, ৩৯ বছর বয়সে এসে সে যা করেছে, তা অবিশ্বাস্য। সে যতদিন চাইবে ততদিন খেলবে। ফুটবল মাঠে পা রাখা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার সে। তবে, ৮ গোল করে থামায় ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপের (১০ গোল) কাছে এবার গোল্ডেন বুট হারাতে হয়েছে মেসিকে।
৬৫ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ নয়, বরং সর্বজ্যেষ্ঠ কোচ হিসেবে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার নজির গড়লেন দে লা ফুয়েন্তে। দল জয়ের আনন্দে অ্যালেক্স বানো এবং মার্ক কুকুরেয়া শরীরে ট্যাটু আঁকানোর শপথ নিলেও স্প্যানিশ বস হেসে উড়িয়ে দিয়ে বলেন, ট্যাটু আঁকানোর জন্য আমার বয়স একটু বেশিই হয়ে গেছে ভাই!
খেলোয়াড়দের খিদে কতটা, তা বোঝাতে গিয়ে দে লা ফুয়েন্তে জানান, ছেলেরা আমাকে ড্রেসিংরুমে এসে জিজ্ঞেস করছে, আমাদের আর কী জেতা বাকি রইল? আমি বলেছি, আগামী সেপ্টেম্বরে নেশনস লিগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটা জেতাই এখন আমাদের মূল লক্ষ্য। কারণ এই স্প্যানিশ মেশিন কখনো ক্লান্ত হয় না!
স্প্যানিশ কোচ লা রোজার দলের মধ্যকার চমৎকার পারিবারিক বন্ধন ও ঐক্যকে শ্রদ্ধা ভরে স্মরণ করে ডি লা ফুয়েন্তে বলেন, ফুটবলারদের এই পুরো প্রজন্মটির জন্য আমি বিশেষভাবে গর্ববোধ করি, যারা এই নির্দিষ্ট চিন্তাধারার সাথেই বড় হয়েছে, এটাকে আরও সমৃদ্ধ করেছে এবং আমাদের সামনে একটি দল—বরং একটি পরিবারের অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছে। এরা সবাই অসাধারণ প্রতিভার অধিকারী খেলোয়াড়। এই দীর্ঘ পথচলায় তাদের সঙ্গী হতে পারাটা আমার জন্য অত্যন্ত সম্মানের।
তিনি আরও যোগ করেন, পেছনের দিনগুলোর কথা মনে পড়লে আমি সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ি। খেলোয়াড়দের সাথে আমাদের অনেক কথা হয়েছে: আমরা সবকিছু জিতে নিয়েছি এবং এটা সত্যিই দারুণ এক অনুভূতি। এই প্রজন্মের ফুটবলাররা পুরো স্পেনের জন্য এক পরম গর্বের উৎস। সবাই মিলে একসাথে থাকলে আমরা আরও অনেক বেশি শক্তিশালী।
স্প্যানিশ বস বলেন, আমার মনে হয় ম্যাচের ভাগ্য আরও আগেই নির্ধারিত হয়ে যাওয়া উচিত ছিল। ডিবুর (এমিলিয়ানো মার্টিনেজ) কিছু অবিশ্বাস্য সেভ আমাদের আগেই জয়ী হতে দেয়নি; তবে শেষ পর্যন্ত এটা তো বিশ্বকাপের ফাইনাল! তাই প্রতিপক্ষ দল শেষ মুহূর্তে ১০ জনের হয়ে যাওয়ার পরও জয়ের জন্য আপনাকে কষ্ট সহ্য করতেই হবে।
একদিকে স্পেনের নিরেট রক্ষণ, উনাই সিমনের গোল্ডেন গ্লাভস আর কুবার্সির সেরা উদীয়মান তারকার পুরস্কার, অন্যদিকে আর্জেন্টিনার কান্না, লাল কার্ডের বিতর্ক আর ট্রাম্পকে পিঠ দেখানোর হট ড্রামা! সব মিলিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপের শেষ অধ্যায়টি স্পোর্টস হিস্ট্রিতে অন্যতম সসি ও খবরের শিরোনামে ঠাঁই পাওয়া ড্রামাটিক ফাইনাল হিসেবে চিরভাস্বর হয়ে রইল!
তথ্যসূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও ফিফা ডটকম