মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ট্রফিটি যখন বিখ্যাত ব্র্যান্ড 'লুই ভিটোঁ'-র সুটকেস থেকে বের করে আনা হলো, তখনই বোঝা গিয়েছিল ২০২৬ বিশ্বকাপের সমাপনী দৃশ্যটি কোনো সাধারণ ফুটবল ম্যাচ দিয়ে শেষ হতে যাচ্ছে না! প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো কাচের ঘেরাটোপে পাশাপাশি বসে চশমা উঁচিয়ে এই আলোঝলমলে নাটকটি উপভোগ করলেন।
পুরস্কার প্রদান মঞ্চে ট্রাম্প যেভাবে বিজয়ী স্প্যানিশ অধিনায়ক রদ্রির ছবি তোলার মুহূর্তে কিছুটা অনাহূতভাবেই জড়িয়ে রইলেন, তা দেখে মনে হচ্ছিল ফুটবলের এই মহাযজ্ঞটি যেন খেলাধুলার চেয়েও ব্যক্তির মহিমাকীর্তন আর রাজনৈতিক পাওয়ার প্লে দেখানোর এক সুবর্ণ সুযোগ ছিল।
সেলিব্রিটি চমক আর এক মিলিয়ন ডলারের টিকিট: ফুটবলের যে আসল লড়াই তা যেন তারকাদের গ্ল্যামার আর বিশাল খরচের নিচে চাপা পড়ে গিয়েছিল। ফাইনালের আগে ভিআইপি গ্যালারিতে বসা ২৩৫ জন মেগাস্টারের তালিকা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করে ফিফা!
এমনকি হলিউড সুপারস্টার টম ক্রুজ যখন ম্যাচ শুরুর আগে মাইক্রোফোন হাতে অনুপ্রেরণামূলক ভাষণ দিতে নামলেন, তখন গ্যালারির উন্মাদের মতো চিৎকার করা আর্জেন্টাইন সমর্থকদের গর্জনে তাঁর কথা একপ্রকার হারিয়েই গেল! ওটাই ছিল সারাদিনের মধ্যে একমাত্র মুহূর্ত, যেখানে কর্পোরেট জাঁকজমককে ছাপিয়ে আসল ফুটবলীয় উন্মাদনা জেগে উঠেছিল।
আর যেসব দর্শক মাঠের একদম পাশে বসে ম্যাচ দেখার জন্য এক লাখ ডলার বা প্রায় সাড়ে সাত লাখ পাউন্ড পর্যন্ত খসিয়েছিলেন, তারা হয়তো বুঝেছেন যে, অতিরিক্ত টাকা ঢাললেই মাঠে ভালো ফুটবলের নিশ্চয়তা পাওয়া যায় না!
মাঠের ম্যাড়ম্যাড়ে ফুটবল ও ঐতিহাসিক ট্রফি স্পেনের: মাঠের খেলাটা কিন্তু মেটলাইফ স্টেডিয়ামের জমকালো আয়োজনের সাথে ঠিক তাল মেলাতে পারেনি। ফাইনাল ম্যাচটি পরিণত হয়েছিল একটি খিটখিটে, ধীরগতির এবং অন্যতম বিরক্তিকর এক স্নায়ুযুদ্ধে! তবে ব্যক্তিগত প্রতিভার পেছনে দৌড়ানো টুর্নামেন্টে শেষ পর্যন্ত স্পেনের এই বিশ্বজয় প্রমাণ করেছে, দলীয় ফুটবলই শেষ কথা। অতিরিক্ত সময়ে ফেরান তোরেসের সেই জয়সূচক গোল স্পেনকে ফুটবলের সিংহাসনে বসায়।
অন্যদিকে, ১টি গোল বাদে পুরো টুর্নামেন্টে আর কোনো গোল না হজম করা স্প্যানিশ রক্ষণভাগ এবং উনাই সিমনের দুর্দান্ত ফর্মই তাদের ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ এনে দেয়। অপরদিকে ক্যালিফোর্নিয়ার নতুন বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তাপ আর রেফারিংয়ের তোপের মুখে আর্জেন্টাইনদের কপাল পুড়েছে, তবে মেসিদের এই কান্নায় ভেজা বিদায় অন্তত এই অতি-কর্পোরেট আয়োজনে কিছুটা হলেও খাঁটি মানবিক আবেগ ফুটিয়ে তুলতে পেরেছে।
১৫ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা আর ফিফার মেগাপ্ল্যান: ফিফা সভাপতি জিয়ানি ইনফান্তিনো এই টুর্নামেন্ট থেকে প্রায় ১৫ বিলিয়ন ডলার আয়ের মুখ দেখেছেন, যা তাদের সব পূর্বাভাসকে ছাড়িয়ে গেছে। আর এই বিপুল আয়ের পর ফিফা যে আর ছোট পরিসরে ফিরবে না, তা নিশ্চিত!
গুঞ্জন উঠেছে খুব শিগগিরই হয়তো ৪৮ দল থেকে বাড়িয়ে ৬৪ দলের বিশ্বকাপ দেখার দিন আসছে। মেক্সিকোর ঐতিহাসিক অ্যাজটেকা স্টেডিয়ামের সেই আদি অকৃত্রিম ফুটবল উন্মাদনা আর আমেরিকার শহরের জাঁকজমক, সব মিলিয়ে এটি ছিল অর্থ, রাজনীতি আর স্পোর্টসের এক অদ্ভুত মিশেল।
একদিকে ট্রাম্প-ইনফান্তিনোর ক্ষমতার প্রদর্শন, অন্যদিকে মেসির অশ্রুসজল চোখে গ্যালারির বিদায়, সব মিলিয়ে ২০২৬ সংস্করণের এই বিশ্বকাপ ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে ব্যয়বহুল, নাটকীয় এবং খবরের শিরোনামে থাকা এক চটকদার আর রসালো অভিজ্ঞতা হয়ে চিরস্মরণীয় হয়ে রইল!