মাঠের ফুটবলের রোমাঞ্চকে ছাপিয়ে ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের নেপথ্যে ঘটে গেছে হাড়হিম করা সব সন্ত্রাসী চক্রান্তের ঘটনা! বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আসরে কেবল গোল আর ড্রিবলিং নয়, তারকাদের মাথার ওপর সার্বক্ষণিক ঝুলছিল মারাত্মক হামলার হুমকি। বিশেষ করে মহাতারকা লিওনেল মেসিকে হত্যার নীল নকশা থেকে শুরু করে ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোকে স্টকিং, লিক হওয়া এক গোপন পুলিশি নথিতে প্রকাশ পেয়েছে এমন সব রোমাঞ্চকর ও চাঞ্চল্যকর তথ্য।
স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘ইনফরমাসিয়ন’ এর মাধ্যমে ফাঁস হওয়া নথিতে দেখা যায়, মার্কিন তদন্ত সংস্থা এফবিআই এবং ইন্টারপোলসহ আন্তর্জাতিক যৌথ নিরাপত্তা কেন্দ্র (আইপিসিসি) পুরো টুর্নামেন্টজুড়ে কীভাবে দিনরাত এক করে খেলোয়াড়, রেফারি ও কর্মকর্তাদের সুরক্ষা দিয়ে গেছে।
‘মেসিকে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা’
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আর্জেন্টিনা অধিনায়ক লিওনেল মেসি ছিলেন সন্ত্রাসী ও উগ্র সমর্থকদের প্রধান টার্গেট। সবথেকে ভয়াবহ ঘটনাটি ঘটে আর্জেন্টিনার জর্ডানের মুখোমুখি হওয়ার আগে। এক আমেরিকান টেক্সাসের ডালাস বিমানবন্দরে ফোন করে দাবি করে, সে এবং তার দুই সঙ্গী ‘হোমমেড বোমা ও এআর-১৫ আধা-স্বয়ংক্রিয় রাইফেল’ নিয়ে স্টেডিয়ামের দিকে রওনা হয়েছে। ওই ব্যক্তি স্পষ্ট হুমকি দেয় যে তারা পুলিশ ও দুই দলের খেলোয়াড়দের ওপর হামলা চালাবে, যার মধ্যে তার বিশেষ লক্ষ্য ছিল মেসি!
অ্যাটলান্টায় ৭ জুলাই আর্জেন্টিনা ও মিসরের মধ্যকার ম্যাচের সময়ও আসে আরেক প্রাণনাশের হুমকি। সামাজিক মাধ্যম এক্সে এক ব্যবহারকারী লেখে, আমি শরীরে চারটি বোমা বেঁধে অ্যাটলান্টা স্টেডিয়ামে ঢুকছি মেসিকে উড়িয়ে দিতে। শুধু তা-ই নয়, আরেক ব্যক্তি ফোন করে দাবি করে যে স্টেডিয়ামের ৩টি ডাস্টবিনে বোমা রাখা আছে। সাথে সাথে স্নাইপার ও ডগ স্কোয়াড পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে তল্লাশি চালায়।
রোনালদোকে তাড়া করে ফেরা ‘স্টকার’
অন্যদিকে, পর্তুগিজ সুপারস্টার ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো ছিলেন সবচেয়ে বেশি হয়রানি বা স্টকিংয়ের শিকার। ১৪ জুন ফিফার এক কর্মকর্তা হিউস্টনের টিম হোটেলের সামনে এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে রোনালদোর রুমের বিস্তারিত খোঁজাখুঁজি করতে দেখেন। দু’দিন পর পুলিশ ওই হোটেলে হানা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করে।
কানাডাতেও ঘটে একই কাণ্ড! এক ভক্ত জোর করে রোনালদোর সাথে লিফটে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে আটকে দেয়। পরে সে নির্লজ্জের মতো দাবি করে, সে নাকি শুধু একটি সেলফি তুলতে চেয়েছিল! মিয়ামি থেকে শুরু করে ক্রোয়েশিয়া ম্যাচ চলাকালে মাঠে ভক্তের ঢুকে পড়া—রোনালদোকে রক্ষা করতে নিরাপত্তা কর্মীদের রীতিমতো কালঘাম ছুটতে হয়েছে।
এমবাপের কুশপুত্তলিকা দাহ ও প্রাণনাশের হুমকি
হয়রানির তালিকা থেকে বাদ পড়েননি অন্যান্য বিশ্বখ্যাত তারকারাও। প্যারাগুয়ের গোলরক্ষকের সাথে মাঠে বিবাদে জড়িয়ে বর্ণবাদী আক্রমণের শিকার হন ফরাসি ফরোয়ার্ড কিলিয়ান এমবাপে। এমনকি প্যারাগুয়েতে এমবাপ্পের একটি পুতুল বানিয়ে তা প্রকাশ্যে পুড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়!
সহজ গোলের সুযোগ মিস করায় নরওয়ের ফরোয়ার্ড আলেকজান্ডার সরলথ ও তাঁর স্ত্রীকে সরাসরি মেরে ফেলার হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া, কলম্বিয়ার এই ফুটবলার জামিনটন ক্যাম্পাজ পেনাল্টি মিস করার পর এমন হুমকি পান যে সতীর্থদের সাথে দেশে ফেরাই তাঁর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছিল।
রেফারিদের ওপর ক্ষোভের শেষ ছিলো না। আর্জেন্টিনা-মিসর ম্যাচ পরিচালনায় বিতর্কিত ভূমিকার জন্য ফরাসি রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ারের ব্যক্তিগত হোয়াটসঅ্যাপে ৬ হাজারের বেশি হুমকিমূলক মেসেজ পাঠায় ক্ষুব্ধ মিসরীয় সমর্থকরা! বিশ্বকাপের মঞ্চে ফুটবলাররা যখন কোটি মানুষের উন্মাদনা যোগাচ্ছিলেন, তখন ড্রেসিংরুমের আড়ালে বোমার হুমকি আর স্নাইপারের নজরদারিতে যে এক ভিন্ন নাটক জমে উঠেছিল, তা এই ফাঁসে হওয়া নথিতে পরিষ্কার হয়ে গেল!