পুলিশ লকআপে তৃণমূলের প্রাক্তন কাউন্সিলরের স্বামীর মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তপ্ত হালিশহর। মৃত বিরজু কেওটের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে যান তৃণমূল নেত্রী তথা প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তৃণমূলের রাজ্যসভার সাংসদ দোলা সেন, সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়সহ দলের একাধিক নেতা-নেত্রী। মৃতের পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও পরিবারের তরফে জানিয়ে দেওয়া হয়, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক সাহায্য চান না। তাঁদের দাবি, ঘটনার প্রশাসনিক ও বিচারিক তদন্তের মাধ্যমে তাঁরা শুধু ন্যায়বিচার চান। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাৎ নিয়ে টানাপোড়েনের মধ্যেই বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মৃতের দাদার সঙ্গেও কথা বলেন তিনি।
শুক্রবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনার কাঁচরাপাড়ার ২৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা বিরজু কুমারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তিনি তৃণমূল কর্মী বলে পরিচিত। এলাকায় তোলাবাজি-মারামারির অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় বলেই জানান তদন্তকারীরা। পরিবারের দাবি, গ্রেপ্তারের পর তাঁর মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয়। সন্ধ্যায় তাঁর স্ত্রী লকআপে দেখাও করতে গিয়েছিলেন। সেই সময় বিরজু সুস্থই ছিলেন বলে জানান তাঁর স্ত্রী। হালিশহর থানার পুলিশের দাবি, শুক্রবার ভোররাতে ওই যুবককে অসুস্থ অবস্থায় লকআপে পড়ে থাকতে দেখা যায়। কল্যাণী জহরলাল নেহেরু হাসপাতাল নিয়ে গেলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে।
ওই নিহত তৃণমূল কর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে রবিবার দুপুরে হালিশহরে যান বাংলার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর সঙ্গে ছিলেন কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, উপাসনা চৌধুরী। বিক্ষোভের মুখে পড়েন মমতা। তাঁকে লক্ষ্য করে জল ও কাদা ছোড়া হয়। জুতোও ছোড়া হয়। ‘চোর ও ডাকাতরানি’ স্লোগানও দেওয়া হয়। যদিও প্রবল বিক্ষোভের মাঝেই নিহত তৃণমূল কর্মীর স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন মমতা। বিক্ষোভের ঘটনার প্রবল সমালোচনা করেন তিনি।
গোটা ঘটনায় ক্ষুব্ধ রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি বলেন, এটা করা যায় না। এটা বাংলার রীতি নয়। তবে ঘটনার সঙ্গে বিজেপির যোগ নেই বলেও দাবি করেছেন শমীক। এ প্রসঙ্গে অগ্নিমিত্রা পাল বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিগত ১৫ বছর ধরে অনেক ভুল করেছেন, নারীদের সম্মান রক্ষা করতে পারেননি বা সাধারণ মানুষের ওপর অত্যাচার চালিয়েছেন। এমনকী অভয়ার মৃত্যুর দিনটিতেও তিনি সঠিক বিচার দিতে পারেননি। কিন্তু তাই বলে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা ছোড়া, ‘চোর’ স্লোগান দেওয়া বা জুতো ছোড়া কোনওভাবেই সমর্থনযোগ্য নয়।”
এদিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিজেপির বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ তোলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, হালিশহরে তাঁর গাড়ি লক্ষ্য করে কাদা, ইট-পাথর ছোড়া হয়েছে এবং তাঁর উপর হামলার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টা তাঁর গাড়ি আটকে রাখা হয় বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
ঘটনায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তৃণমূল নেত্রী। স্থানীয় আইসির বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ করে এই ঘটনার পিছনে তাঁর ভূমিকা রয়েছে বলেও দাবি করেন মমতা। একইসঙ্গে রাজ্য সরকার ও মুখ্যমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও সরব হন তিনি।
তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, এটি যদি কাস্টডিয়াল ডেথ হয়ে থাকে, তাহলে তার বিচার হবেই। পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে বিচারপ্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা যাবে না বলেও দাবি করেন তিনি। ঘটনার দায় নিয়ে রাজ্যের ডিজি এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কমিশনারের পদত্যাগও দাবি করেন কল্যাণ।
তৃণমূল নেতৃত্বের অভিযোগ, স্থানীয় বিধায়ক পরিবারের সদস্যদের ভয় দেখিয়ে গিয়েছেন এবং তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেওয়া হয়েছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, এই ঘটনার শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবে তৃণমূল কংগ্রেস এবং মৃতের পরিবারকে ন্যায়বিচার পাইয়ে দেওয়ার জন্য তাঁরা সমস্ত স্তরে যাবেন।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সফরকে কেন্দ্র করে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে ব্যাপক পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।