টেনিস দুনিয়ায় নতুন ইতিহাস রুশ তরুণী মিরা আন্দ্রেভার

মাত্র ১৫ বছর বয়সেই টেনিস দুনিয়ায় নিজের আগমনী বার্তা দিয়ে রেখেছিলেন রুশ টেনিস বিস্ময় মিরা আন্দ্রেভা। আর ১৯ বছর বয়সে পা রাখতেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করলেন গ্র্যান্ড স্ল্যাম চ্যাম্পিয়ন হিসেবে। শনিবার ফ্রেঞ্চ ওপেনের ফাইনালে পোল্যান্ডের ১১৪ নম্বর র‍্যাঙ্কিংধারী কোয়ালিফায়ার মায়া চোয়ালিনস্কাকে সরাসরি সেটে (৬-৩, ৬-২) উড়িয়ে দিয়ে নারী এককের ঐতিহাসিক শিরোপা নিজের করে নিয়েছেন বিশ্বের আট নম্বর তারকা আন্দ্রেভা।

১৯৯২ সালে কিংবদন্তি মনিকা সেলেস মাত্র ১৮ বছর বয়সে যখন তাঁর টানা তৃতীয় ফ্রেঞ্চ ওপেন ট্রফি জিতেছিলেন, তারপর থেকে মিরা আন্দ্রেভাই হলেন কনিষ্ঠতম খেলোয়াড় যিনি ক্লে-কোর্টের এই মর্যাদাপূর্ণ টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।

Mirra Andreeva 05
অন্যদিকে, মায়া চোয়ালিনস্কার সামনে সুযোগ ছিল ফ্রেঞ্চ ওপেনের ইতিহাসে প্রথম কোয়ালিফায়ার হিসেবে শিরোপা জিতে রূপকথা তৈরি করার, কিন্তু মিরার অদম্য শক্তির সামনে পোলিশ কন্যার সেই স্বপ্ন আজ চূর্ণ হয়ে গেছে। ম্যাচের প্রথম ম্যাচ পয়েন্টেই যখন আন্দ্রেভা একটি দুর্দান্ত ব্যাকহ্যান্ড ক্রস-কোর্ট উইনার শট মারেন, জয় নিশ্চিত হতেই তিনি লাল মাটির কোর্টে হাঁটু গেড়ে বসে দুই হাত উঁচিয়ে আবেগে ভেসে যান।

২০২৩ সালের মাদ্রিদ ওপেনে মাত্র ১৫ বছর বয়সে ডব্লিউটিএ ১০০০ টুর্নামেন্টের কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে ইতিহাস গড়ার পর থেকেই মিরাকে ভবিষ্যতের গ্র্যান্ড স্ল্যাম জয়ী হিসেবে ধরা হচ্ছিল। তবে এই ট্রফি জয়ের পথটা মিরার জন্য মোটেও সহজ ছিল না। ২০২২ সালে শুরু হওয়া ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে আন্তর্জাতিক টেনিসে নিজ দেশের পতাকা এবং জাতীয়তা ছাড়া সম্পূর্ণ ‘নিরপেক্ষ’ মর্যাদা নিয়ে খেলছেন এই রুশ তরুণী।

Mirra Andreeva 02
চলতি টুর্নামেন্টের সেমিফাইনালে ইউক্রেনের মার্তা কস্ত্যুককে যখন তিনি পরাজিত করেন, তখন নিয়ম অনুযায়ী প্রতিপক্ষ ইউক্রেনীয় খেলোয়াড় মিরার সাথে হাত মেলাতে অস্বীকৃতি জানান। শুধু তাই নয়, ফাইনালের মঞ্চ ‘কোর্ট ফিলিপ-শ্যাঁত্রিয়ে’ পোলিশ দর্শক ও লাল-সাদা পতাকায় ঠাসা ছিল।

ম্যাচের শুরুতে যখন পোলিশ কন্যা মায়াকে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, তখন পুরো স্টেডিয়াম ‘মা-যা, মা-যা’ চিৎকারে ফেটে পড়েছিল। দর্শকদের পুরো সমর্থন চোয়ালিনস্কার দিকে থাকলেও, একা লড়ে যাওয়া মিরার পক্ষে গ্যালারির এক কোণ থেকে শুধু রুশ ভাষায় একটি চিৎকার শোনা গিয়েছিল, ‘দাভাই মিরা!, অর্থাৎ এগিয়ে যাও মিরা। দর্শক এবং মাঠের বাইরের সব প্রতিকূলতাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ১৯ বছরের এই মেয়েটি আজ টেনিস বিশ্ব জয় করলেন।

Mirra Andreeva 03
এই ঐতিহাসিক জয়ের মাধ্যমে মিরা আন্দ্রেভা এক অনন্য কীর্তি গড়ে তাঁর বর্তমান কোচ কোনচিতা মার্টিনেজকেও ছাড়িয়ে গেলেন। স্প্যানিশ কিংবদন্তি কোনচিতা ২০০০ সালের ফ্রেঞ্চ ওপেন ফাইনালে ফরাসি তারকা মেরি পিয়ার্সের কাছে হেরে রানার্স-আপ হয়েছিলেন। কাকতালীয়ভাবে, সেই মেরি পিয়ার্স নিজেই চ্যাম্পিয়ন মিরার হাতে উইনার্স ট্রফিটি তুলে দেওয়ার জন্য মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন।

ফাইনাল ম্যাচটি মূলত রৌদ্রোজ্জ্বল আবহাওয়ার মধ্যে শুরু হলেও, তীব্র বাতাস দুই নতুন ফাইনালিস্টের জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছিল। ম্যাচের প্রথম পয়েন্টেই ডাবল-ফল্ট করে বসেন পোলিশ তারকা চোয়ালিনস্কা, তবে পঞ্চম গেমে গিয়ে তিনিই প্রথম নিজের সার্ভিস ধরে রাখতে পেরেছিলেন। কিন্তু খেলার গতি বাড়ার সাথে সাথে মিরা আন্দ্রেভা তীব্র বাতাসকে জয় করার মন্ত্র খুঁজে পান। মায়ার একের পর এক স্পিন ও ড্রপ শটের নিখুঁত জবাব দিয়ে ম্যাচটি নিজের পকেটে পুরে নেন মিরা।

Mirra Andreeva 04
নারী এককের ফাইনাল শেষ হতেই এখন টেনিস বিশ্বের নজর রোববারের হাই-ভোল্টেজ পুরুষ এককের ফাইনালের দিকে। যেখানে শিরোপার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবেন জার্মানির আলেকজান্ডার জভেরেভ এবং ইতালির ফ্ল্যাভিও কোবোলি। সাম্প্রতিক স্মৃতির সবচেয়ে উত্তেজনাপূর্ণ এবং নাটকীয় এই গ্র্যান্ড স্ল্যামের পর্দা নামবে এই ম্যচের মধ্য দিয়ে।

এদিকে, ছেলেদের দ্বৈত বা পুরুষ ডাবলসের ফাইনালে শীর্ষ বাছাই মার্সেল গ্রানোলাসের্স এবং হোরাসিও জেবালোস জুটি নিজেদের শিরোপা অক্ষুণ্ণ রেখেছেন। ফাইনালে তাঁরা ৬-৪, ৬-২ ব্যবধানে সরাসরি সেটে হ্যারি হেলিওভারা এবং হেনরি প্যাটেন জুটিকে পরাজিত করে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। তবে সব আলো কেড়ে নিয়ে আজ টেনিসের নতুন রানী হিসেবে ক্লে-কোর্টের রাজসিংহাসনে বসলেন ১৯ বছরের রুশ কন্যা মিরা আন্দ্রেভা।