ভিক্টোরীয় যুগে গঠিত এক অধ্যাত্মিক ও যৌন-উপাসক গোষ্ঠী 'অ্যাগা পিমোনাইটস'-কে ঘিরে শতাব্দীরও বেশি সময় পর আজও বিশ্বজুড়ে অদম্য কৌতূহল রয়েছে। ইংল্যান্ডের সমারসেটের ব্রিজওয়াটারের কাছে স্প্যাক্সটনের এক রহস্যময় চ্যাপেলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই দলটির ক্রিয়াকলাপ তৎকালীন সমাজের ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সম্প্রতি 'এ ভেরি ব্রিটিশ কাল্ট' বইয়ের লেখক ও বিবিসির সাবেক সাংবাদিক স্টুয়ার্ট ফ্লিন্ডারস এই গোষ্ঠীর নানা অজানা তথ্য ও অন্ধকার ইতিহাস তুলে ধরেছেন।
এই ধার্মিক গোষ্ঠীর প্রতিষ্ঠাতা হেনরি জেমস প্রিন্স পেশায় ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট চার্চের এক যাজক। স্প্যাক্সটনের কাছে চার্লিঞ্চ গ্রামে কাজ করার সময়ই তিনি অধিকাংশ বিশ্বাসীদের ‘জাহান্নামী’ বলে দাবি করে গির্জা থেকে বিতাড়িত হন। পরে তিনি নিজেকে ঈশ্বর বা 'পবিত্র আত্মা'-র মানবীয় রূপ বলে ঘোষণা করেন। পরিস্থিতি এতটাই অদ্ভুত ছিল যে, তিনি নাকি দৈনন্দিন আবহাওয়ার পূর্বাভাস জানার জন্যও নিজের সাথে নিজেই পরমাত্মার মতো কথোপকথন চালাতেন!
চার্চ অফ ইংল্যান্ড থেকে বহিষ্কৃত হওয়ার পর প্রিন্স স্প্যাক্সটনে জমি কিনে একটি বড় চ্যাপেল ও বাসস্থান তৈরি করেন। সেখানে অনুসারীদের অন্তর্ভুক্ত করার প্রধান শর্ত ছিল কঠোর আনুগত্য এবং নিজেদের সব ধনসম্পদ গোষ্ঠীর তহবিলে সঁপে দেওয়া। কোনো সদস্যের এই ডেরা ত্যাগ করার অনুমতি ছিল না, যার ফলে অনেক সদস্য মানসিক যন্ত্রণায় আত্মহত্যা করতে বাধ্য হন।
সম্পদ দখল ও বিকৃত যৌন আচার: ধনকুবের পরিবারের তিন বোন- নটিজ সিস্টার্সদের ঘটনাটি এর অন্যতম উদাহরণ। এই তিন বোন তৎকালীন প্রায় ৬,০০০ পাউন্ড (যা বর্তমান মূল্যে প্রায় ৫ লাখ পাউন্ডের সমান) উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন। প্রিন্স তাদের ঈশ্বরের বাণী শুনিয়ে তার অনুসারীদের বিয়ে করতে বাধ্য করেন। তৎকালীন ১৯শ শতাব্দীর আইন অনুযায়ী স্ত্রীদের যাবতীয় সম্পদ স্বামীদের অধীনে চলে যেত, আর সেই সুযোগে সব অর্থ সরাসরি স্থানান্তরিত হয় অ্যাগা পিমোনাইটসের রাজকোষে।
এই চ্যাপেলের দেয়ালের ভেতরে পরিচালিত হতো অদ্ভুত ও বিকৃত যৌনচার, যা জনপ্রিয় 'দ্য হ্যান্ডমেইডস টেল' নাটকের দৃশ্যগুলোর কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রিন্স নিজেকে পবিত্র আত্মার রূপ দাবি করে অন্যান্য নারীদের সাথে দৈহিক সম্পর্কে লিপ্ত হতেন, আর তাঁর স্ত্রী পাশে বসে পুরো দৃশ্য প্রত্যক্ষ করতেন।
যীশুখ্রিস্ট সেজে উন্মাদনা ও সমাপ্তি: ১৮৯৯ সালে প্রিন্সের মৃত্যুর পর জন হিউ স্মিথ-পিগট নামের আরেক চ্যাপেলের দায়িত্ব নেন। ১৯০২ সালে লন্ডনের একটি গির্জায় ধর্মোপদেশ দেয়ার সময় পিগট নিজেকে ‘পুনরুজ্জীবিত যীশুখ্রিস্ট’ বলে দাবি করেন। এই ঈশ্বর নিন্দার খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাস্তায় দাঙ্গা শুরু হয় এবং ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে বাঁচতে পিগট সমারসেটে আত্মগোপন করেন। ১৯২৭ সালে তাঁর মৃত্যুর পর গুজব রটেছিল, অনুসারীরা তাকে সশরীরে বেহেশতে যাওয়ার সুবিধার জন্য দাঁড় করিয়ে কবর দিয়েছিল!
পিগটের মৃত্যুর পর সময়ের আবর্তে গোষ্ঠীটি বিলুপ্ত হয়ে যায় এবং চ্যাপেলটি এক প্রকার বৃদ্ধাশ্রমে পরিণত হয়। ১৯৬০-এর দশকে চ্যাপেলটি বিক্রি করে একটি টিভি স্টুডিওতে রূপান্তর করা হয়, যেখানে ‘ক্যাম্বারউইক গ্রিন’ ও ‘ট্রাম্পটন’-এর মতো জনপ্রিয় অনুষ্ঠান তৈরি হতো। বর্তমানে ভিক্টোরীয় যুগের অনৈতিক আচারের এই ঐতিহাসিক কেন্দ্রটি 'এয়ারবিএনবি' হিসেবে পর্যটকদের জন্য ভাড়া দেওয়া হয়।