রাজধানীর পুরনো ঢাকার লালবাগের এক নিভৃত গলি এখন এক অভূতপূর্ব ও হৃদয়স্পর্শী শোকের আবহে আচ্ছন্ন। সেখানে কোনো রাজনৈতিক নেতা বা বিখ্যাত ব্যক্তিত্বের জন্য নয়, বরং কালো ব্যানার টাঙানো হয়েছে এলাকার সবার প্রিয় চারপাঅলা বন্ধু 'টমি'র স্মরণে।
টানা ১০ বছর ধরে যে কুকুরটি লালবাগের পথঘাট আগলে রেখেছিল এক অতন্দ্র প্রহরীর মতো, তার চলে যাওয়ার চারদিন পরও পুরো এলাকাবাসীর চোখ অশ্রুসজল, হৃদয় ভারাক্রান্ত।
এদেশে যেখানে পথের প্রাণীরা প্রায়ই অবহেলা, ঘৃণা কিংবা নির্মমতার শিকার হয়, সেখানে লালবাগের এই ছোট্ট গলির মানুষগুলো অবলা এক প্রাণীর প্রতি ভালোবাসার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কারো কাছে সে ছিল ‘টমি রাজা’, আবার কারো কাছে শুধুই আদরের পুতুল।
টমির এই ভালোবাসার গল্পের সূচনা এক দশক আগে। লালবাগের বাসিন্দা মো. নাজিমউদ্দিন শঙ্কর প্রজাতির মাত্র ১৫ দিন বয়সী এক মাতৃহীন কুকুরছানাকে কুড়িয়ে এনে পরম স্নেহে কোলে-পিঠে করে মানুষ করতে শুরু করেন। সময়ের সাথে সাথে সেই অবলা ছানাটি কেবল নাজিমউদ্দিনেরই বিশ্বস্ত ছায়া হয়ে ওঠেনি, বরং পুরো লালবাগবাসীর প্রিয় পাত্রে পরিণত হয়।
টমির শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পর স্তব্ধ হয়ে গেছেন তার অভিভাবক নাজিমউদ্দিন। প্রিয় সঙ্গীর স্মৃতি আঁকড়ে ধরে প্রতিটি মুহূর্ত কাটাতে গিয়ে কান্না ধরে রাখতে পারছেন না তিনি। ১০ বছর ধরে লালবাগের প্রতিটি অলিগলিতে যার অবাধ বিচরণ ছিল, সেই টমিকে হারিয়ে নিস্তব্ধ পুরো এলাকা।
জাপানের সেই বিখ্যাত কুকুর 'হাচিকো'র কথা বিশ্ববাসী জানে, যে তার মালিকের মৃত্যুর পরও টোকিওর শিবুয়া স্টেশনে টানা ৯ বছর অপেক্ষা করেছিল। হাচিকোকে ভালোবেসে টোকিও নগর কর্তৃপক্ষ গড়ে তুলেছিল ব্রোঞ্জের ভাস্কর্য। আমাদের লালবাগের টমি হয়তো কোনো ব্রোঞ্জের মূর্তি পায়নি, তবে পেয়েছে সাধারণ মানুষের হৃদয়ের গভীরতম শ্রদ্ধা ও নিখাদ ভালোবাসা।
সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে 'ভাইরাল' হওয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিল না এই গভীর অনুভূতির পেছনে। শহরের আনাচে-কানাচে যখন মানুষের নিষ্ঠুরতায় প্রাণ হারায় অগণিত অবলা পথপ্রাণী, তখন লালবাগের মানুষগুলো টমির প্রতি এই অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শোকগাথা প্রকাশ করে প্রমাণ করল—স্বার্থহীন মানবিকতা ও ভালোবাসার দিগন্ত এখনো ফুরিয়ে যায়নি।