আগামী অর্থবছরের (২০২৪-২৫) বাজেটে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ছয় শতাংশের ঘরে আটকে রাখার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, তা আদৌ বাস্তবসম্মত কিনা, এ নিয়ে প্রশ্নে উঠেছে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে গত দেড় বছর ধরেই ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে মূল্যস্ফীতির পারদ। প্রশ্ন হচ্ছে, হঠাৎ করেই তা নেমে আসবে কীভাবে।
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের বাজেট পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, যেখানে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ছয় দশমিক পাঁচ শতাংশ।
চলতি অর্থবছরের বাজেটেও প্রথমে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছিলো সাড়ে ছয় শতাংশ। কিন্তু তা নিয়ন্ত্রণের করতে না পারায় পরে তা বদলে সাড়ে সাত শতাংশে ওঠানো হয়। আর বাস্তবতা হলো, পুরো অর্থবছরেই মূল্যস্ফীতির পারদ থেকেছে ৯ শতাংশেরও বেশি।
তাই বাজেটের লক্ষ্য বাস্তবায়ন সম্ভব না উল্লেখ করে বিশ্লেষকরা বলছেন, কোনো ম্যাজিকেই হুট করে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ সম্ভব না।
তবে অর্থমন্ত্রী আশাবাদী। বাজে বক্তৃতায় তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতির হার কমিয়ে আনার লক্ষ্যে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ এবং রাজস্বনীতিতেও সহায়ক নীতি কৌশল অবলম্বন করা হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ড, ওএমএস ইত্যাদি কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক এম এম জুলফিকার আলী একাত্তরকে বলেন, রাতারাতি এটা আগের মতো পাঁচ, ছয় শতাংশে চলে আসবে, এই আশা করা ঠিক হবে না।
‘যেটা আমরা আশা করতে পারি যে, একটা নিম্নমুখী প্রবণতা। এক থেকে দুই শতাংশও যদি কমিয়ে আনতে পারা যায়,’ যোগ করেন তিনি।
মূল্যস্ফীতির রাশ টানতে প্রস্তাবিত বাজেটে অন্তত ৩০টি প্রয়োজনীয় পণ্য ও খাদ্যশস্য সরবরাহের ওপর উৎসে কর কমানো হয়েছে। ফলে কমছে এসব পণ্যের দাম।
নিত্যপ্রয়োজনীয় এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে- পেঁয়াজ, রসুন, মটর, ছোলা, চাল, গম, আলু, মসুর, ভোজ্যতেল, চিনি, আদা, হলুদ, শুকনা মরিচ, ডাল, ভুট্টা, ময়দা, আটা, লবণ, গোলমরিচ, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, খেজুর, তেজপাতা, পাট, তুলা, সুতা এবং সব ধরনের ফল।
তবে এ উদ্যোগ কতটা কাচে আসবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
একাত্তরকে তিনি বলেন, পণ্যে শুল্ক কমিয়ে আনার কথা প্রস্তাব করা হয়েছে। আমার মনে হয় না, এরকম পরিস্থিতিতে শুল্ক কমিয়ে দিয়ে মূল্যস্ফীতি কমানো যাবে।
এদিকে মূল্যস্ফীতির চাপে নাজেহাল অবস্থা ভোক্তাদের। গত ১৫ মাস দেশে মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ঘরে। দুই মাস ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাব বলছে, গত বছরের মে মাসে খাদ্য মূল্যস্ফীতি যেখানে ছিলো ৯ দশমিক ২৪ শতাংশ। এ বছরের তা এক দশমিক ৫২ শতাংশ বেড়ে হয়েছে ১০ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
টিসিবির তথ্যও বলছে, গত বছর বাজেট প্রস্তাবের সময়ের তুলনায় এবার অন্তত ১০টি পণ্যের দাম বেড়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ বেড়েছে মুগডাল, রসুন ও হলুদের দাম। মূল্যবৃদ্ধির এই তালিকায় আছে, চাল, আলু, পেঁয়াজ থেকে শুরু করে মাছ-মাংসও।
বাজারের এই বাস্তবতায় আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। তবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দেরিতে হলেও বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার বাড়িয়েছে। যদিও তাতে এখন পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি বাগে আনার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।